আদরিণী গল্পের বিষয়বস্তু ক্লাস 12 তৃতীয় সেমিস্টার বাংলা | Adorini Golper Bishoybostu
উৎস
আদরিণী’ গল্পটি প্রথম ১৩২০ বঙ্গাব্দে ‘সাহিত্য’ পত্রিকার ভাদ্র সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে ‘আদরিণী’ গল্পটি ‘গল্পাঞ্জলি’ গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হয়।
প্রেক্ষাপট
মানবেতর পশুর সঙ্গে মানুষের হৃদ্যতা ভারতীয় সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ। মহেন-জো-দারো, হরপ্পা সভ্যতার ইতিহাস থেকে শাস্ত্র-পুরাণ সর্বত্রই কখনও পশুপতি শিবের বর্ণনা বা কখনও ভারতীয় দেবদেবীর বাহনরূপে মানবেতরদের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। আসলে এর অর্থই হল পশু বা মানব সম্পর্কের মধ্যে সুসংহত সামঞ্জস্যবিধান এবং তা জীব ও জগতের সাম্য রক্ষার্থেই। সেই ধারা বেয়ে ভারতীয় সাহিত্যের আঙিনাতেও কেন্দ্রীয় চরিত্ররূপে চিত্রিত হয়েছে প্রাণপ্রিয় পোয্যের সঙ্গে মানুষের স্নেহ-সম্পর্কের চিত্র। বঙ্গসাহিত্যের ধারাতেও অনন্য হয়ে উঠেছে শরৎচন্দ্রের ‘মহেশ’ গল্প, তারাশঙ্করের ‘কালাপাহাড়’ কিংবা ‘জলসাঘর’ গল্পে বর্ণিত ঘোড়া তুফান হয়ে উঠেছে বিশ্বস্তরের তারুণ্যের প্রতীক। এ ছাড়া বিভূতিভূষণের ‘বুধীর বাড়ি ফেরা’, বনফুলের ‘গণেশ জননী’, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘নীলবাহাদুর’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। বাংলা সাহিতো এই প্রসঙ্গেই আসে প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘আদরিণী’ গল্পের কথা।
‘আদরিণী’ গল্পটিকে সত্যঘটনা আখ্যা দিয়ে স্বীকারোক্তি শোনা জায়-“আমি মনঃ কল্পিত ঘটনা লইয়াই অধিকাংশ গল্প লিখিয়া থাকি তবে কচিৎ কখনও বাস্তব জীবনের দুই একটা ঘটনা থাকে বটে, তবে ‘আদরিণী’ গল্পটি এ নিয়মের ব্যতিক্রম। উহার প্রায় চৌদ্দ আনা সত্য। গল্পে এত সত্যঘটনা আর কখনও লিপিবদ্ধ করি নাই।”
সত্যঘটনা বলেই হয়তো শ্রেণি-সমাজ-বাস্তবতার ঊর্ধ্বে এই গল্পের করুণ পরিণতিই গল্পটির একমাত্র আবেদন হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্র সমসাময়িক প্রভাতকুমারের গল্পসমূহে মূলত যে সুরগুলি ধ্বনিত হয় যথা-বাঙালি মধ্যবিত্ত এবং উচ্চমধ্যবিত্ত জীবনের কথকতা বা শিক্ষিত যুবসম্প্রদায়ের সমস্যা ও বিড়ম্বনা অথবা মনুষ্যেতর প্রাণীর সঙ্গে মানুষের দরদভরা সম্পর্ক তেমনই, মনুষ্যেতর-মানুষের চিরন্তন সম্পর্কের গল্প ‘আদরিণী’ করুণ রসাবেদনে পরিপূর্ণ এক চলচ্ছবি হয়ে উঠেছে। ১৩২০ বঙ্গাব্দের ভাদ্র সংখ্যায়, ‘ভারতী’ পত্রিকায় গল্পটি প্রকাশিত হয়। গল্পের পরিণতির মধ্য দিয়ে প্রভাতকুমার দেখাতে চেয়েছেন যে, সবকিছু ছাপিয়ে চিরন্তন মানবিক অনুভূতিগুলিই শেষ পর্যন্ত অটুট থাকে ‘আদরিণী’ গল্পে প্রভাতকুমারের সেই জীবনদর্শনই চিত্রিত হয়েছে।
বিষয়বস্তু
পঞ্চাশোর্ধ্ব জয়রাম মুখোপাধ্যায় পীরগঞ্জের মেজোবাবুর মেয়ের বিয়ের নিমন্ত্রণ পেয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে যাবেন পাড়ার নগেন ডাক্তার ও উকিল কুঞ্জবিহারী। অনেক দূরের পথ। রাস্তাটি ঘোড়ার গাড়িতে যাওয়ার জন্য উপযুক্ত নয়। গোরুর গাড়িতে যাতায়াতে প্রায় চারদিন সময় লাগবে। তাই তিনি হাতিতে যাবেন।
জয়রামবাবু নামকরা মোক্তার। মহারাজ নরেশচন্দ্র তাঁর পুরোনো মক্কেল। জয়রাম, মহারাজের কাছে একটা হাতি চেয়ে লোক পাঠালেন। কিন্তু মহারাজ হাতি দিতে সম্মত হলেন না। সেই ক্ষোভে জয়রাম নিজেই একটি হাতি কিনে ফেললেন। মাদি হাতি- নাম আদরিণী। এইভাবে রাজার অপমানের প্রতিবাদরূপেই জয়রাম মোক্তারের সম্মানের প্রতীক স্বরূপ গল্পে আদরিণীর আবির্ভাব ঘটে।
জয়রাম মোক্তারের পারিবারিক চিত্রটি খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। তাঁর তিন ছেলের কেউই রোজগার করে না। দুই ছেলের স্ত্রী, সন্তান আছে। ছোটো ছেলে কলকাতায় পড়াশোনা করে। জয়রাম নিজে বিপত্নীক।
বছর পাঁচেক পর থেকে মোক্তারবাবুর আর্থিক অবনতি শুরু হয়। উপার্জনেও ভাঁটা পড়ে। নতুন নিয়মে পাশ করা ইংরেজি-জানা তরুণ উকিলে জেলাকোর্ট ভরে যায়। আদালতে জয়রামের সেই প্রতিপত্তিও আর থাকে না। এদিকে সংসারের খরচ দিনে দিনে বাড়তে থাকে। এমতাবস্থায় অনেকেই হাতিটি বিক্রি করে দেওয়ার উপদেশ দিলেন। কিন্তু সন্তানতুল্য আদরিণীকে বিক্রি করার পরামর্শে তিনি সায় দিলেন না। তাই তিনি হাতি ভাড়া দিয়ে সামান্য অর্থ আয় করার উপায় বের করলেন।
জয়রামের দুই বউমা পুনরায় সন্তানসম্ভবা। এদিকে ছোটো ছেলেটিও বিএ পরীক্ষায় অকৃতকার্য হল। আবার বড়ো নাতনির বিয়ের কথাবার্তা চলছে। বড়ো নাতি অসুস্থ হওয়ায় তার চিকিৎসায় অনেক টাকা ব্যয় হয়েছে। কাছারি থেকে অবসর নেওয়ার পর ক্রমে জয়রামের স্বাস্থ্যও ভাঙতে শুরু করেছে। এই অবস্থায় প্রতিবেশী-বন্ধুরা হাতিটি বিক্রি করে দেওয়ার জন্য তাঁকে আন্তরিকভাবে বোঝালেন। নিরুপায় হয়ে জয়রাম আদরিণীকে বিক্রি করতে বামুনহাটের মেলায় পাঠালেন।
জয়রামের বড়ো নাতনি কল্যাণীর বিয়ের দিনক্ষণ পাকা হয়ে গেল। তিনি ভেবেছিলেন হাতি বিক্রির টাকা থেকে গয়না গড়াতে দেবেন। কিন্তু উপযুক্ত ক্রেতার অভাবে অবিক্রিত আদরিণী ঘরে ফিরে এল। এতে জয়রাম-সহ পরিবারের সবাই খুশি হলেন ঠিকই কিন্তু অর্থের চিন্তা রয়েই গেল।
বামুনহাটের মেলা শেষ হওয়ার পর দশ ক্রোশ দূরে রসুলগঞ্জে মেলা বসে। এবার সেই মেলায় আদরিণীকে পাঠানো হল। বিদায়কালে জয়রাম আর আদরিণীর সম্মুখীন হতে পারলেন না। আদরিণীর চোখ থেকে জল পড়তে লাগল। বুকফাটা দীর্ঘশ্বাস সম্বল করে বৃদ্ধ জয়রাম নীরবে অশ্রুপাত করতে লাগলেন।
অভিমানী আদরিণী যে কেবল মনিবের বাড়ি ছেড়ে নয়, ছেড়ে চলল এই জগৎ সংসারও- একথা কেউ-ই বোধ হয় ভাবেনি। হ্যাঁ, সাত ক্রোশ পথ চলার পর পেটের অসহ্য যন্ত্রণায় আদরিণী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ল এবং অচিরেই তার মৃত্যু হল। খবর পেয়ে জয়রাম সেখানে পৌঁছালেন। আদরিণীর মুখের কাছে মুখ রেখে কাঁদতে কাঁদতে বারবার বলতে লাগলেন “অভিমান করে চলে গেলি, মা?”
আদরিণীর মৃত্যুর দু-মাস পরে জয়রামবাবুও মারা গেলেন।
আরও পড়ুন : আদরিণী গল্পের MCQ প্রশ্ন উত্তর
আরও পড়ুন : অন্ধকার লেখাগুছ MCQ প্রশ্ন উত্তর
আরও পড়ুন : দিগ্বিজয়ের রূপকথা কবিতার MCQ