আরোহ অনুমানের স্বরূপ প্রশ্ন উত্তর ক্লাস 12 দর্শন | Aroho Onumaner Sworup Question Answer

১। সাদৃশ্যমূলক আরোহ অনুমান কাকে বলে? উদাহরণ দাও। মন্দ উপমাযুক্তি কাকে বলে? উদাহরণ দাও।
যে আরোহ অনুমানে দুই বা ততোধিক ব্যক্তি বা বস্তুর মধ্যে এক বা একাধিক বিষয়ে সাদৃশ্য লক্ষ করে তাদের মধ্যে অন্য বিষয়েরও সাদৃশ্যের অস্তিত্ব অনুমান করা হয় তাকে উপমাযুক্তি বলে।
উদাহরণ :
রাহুল ও অনিল দুজনেই ভালো ক্রিকেটার।
রাহুল জাতীয় দলে সুযোগ পেয়েছে।
অতএব, অনিলও জাতীয় দলে সুযোগ পাবে।
যে উপমাযুক্তিতে দুটি বিষয়ের সাদৃশ্য নিছকই আকস্মিক, বাহ্যিক, অপ্রাসঙ্গিক ও কম গুরুত্বপূর্ণ হয় এবং তারই ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় তাকে মন্দ বা দুষ্ট বা দুর্বল উপমাযুক্তি বলে।
উদাহরণ :
মানুষ এবং কারখানা, উভয়েরই জন্ম ও বৃদ্ধি আছে।
মানুষ কথা বলতে পারে।
অতএব, কারখানাও কথা বলতে পারবে।
২। আরোহ অনুমানের আকারগত ভিত্তি কাকে বলে? এই ভিত্তিগুলি কী কী? উপমাযুক্তিকে আরোহ যুক্তি বলা হয় কেন?
আরোহ অনুমানের আকারগত ভিত্তি বলতে এমন মৌলিক নিয়মকে বোঝায় যেগুলির উপর নির্ভর করে আরোহ অনুমানের সিদ্ধান্ত স্থাপন করা হয়। আরোহ অনুমানের আকারগত ভিত্তি দুটি। যথা-প্রকৃতির একরূপতা নীতি এবং কার্যকারণ নিয়ম।
প্রকৃতির একরূপতা নীতি: প্রকৃতি হল নিয়মের রাজত্বের অধীন। প্রকৃতি রাজ্যে আকস্মিকভাবে কোনো ঘটনা ঘটতে পারে না। প্রকৃতির সকল ঘটনাই একটি নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসারে ঘটে। প্রকৃতির একরূপতা নীতির মূলকথা হল-প্রকৃতি সম অবস্থায় সম আচরণ করে। যে পরিস্থিতিতে প্রকৃতিতে কোনো ঘটনা একবার ঘটে, অনুরূপ পরিস্থিতিতে আবারও সেই ঘটনা একইরকমভাবে ঘটবে। যে অবস্থায় বা পরিস্থিতিতে কোথাও ভূমিকম্প হয়েছিল, সেই একই অবস্থা বা পরিস্থিতির যদি পুনরাবৃত্তি হয় তবে ভবিষ্যতেও ভূমিকম্প হবে। এর কোনো ব্যতিক্রম হবে না-এটিই হল প্রকৃতির একরূপতা নীতির মূল বৈশিষ্ট্য। এই নীতির উপর আস্থা রেখে আরোহ অনুমানের গঠন বা সামান্য আকার প্রতিষ্ঠিত হয় বলে প্রকৃতির একরূপতা নীতিকে আরোহ অনুমানের আকারগত ভিত্তি বলা হয়।
কার্যকারণ নিয়ম : কার্যকারণ নিয়ম অনুসারে জগতের প্রত্যেকটি কার্যের একটি সুনির্দিষ্ট কারণ আছে। বৈচিত্র্যময় জগতে শূন্য থেকে কোনো কিছুর সৃষ্টি হতে পারে না। প্রত্যেকটি ঘটনার কোনো-না-কোনো কারণ আছে। অভিজ্ঞতায় বারবার দুটি ঘটনাকে একসঙ্গে ঘটতে দেখে ওই দুটি ঘটনার মধ্যে কার্যকারণ সম্বন্ধ আছে বলে মনে করা হয়। এর মধ্যে পূর্ববর্তী ঘটনাটিকে কারণ এবং পরবর্তী ঘটনাটিকে কার্য বলে। যেমন-আগুন হল দহন ক্রিয়ার কারণ। এখানে আগুন হল কারণ এবং দহন ক্রিয়া হল কার্য। কার্যকারণ নিয়ম অনুসারে এক্ষেত্রে ‘আগুন’ এবং ‘দহন ক্রিয়া’-র মধ্যে কার্যকারণ সম্বন্ধ আছে বলে মনে করা হয়। এই কার্যকারণ নিয়মের ভিত্তিতেই আরোহ অনুমানের সামান্যীকরণ করা হয় বলে কার্যকারণ নিয়মকে আরোহ অনুমানের আকারগত ভিত্তি বলা হয়।
১। আরোহ অনুমান সংক্রান্ত লাফ বলতে কী বোঝো? অথবা, আরোহমূলক লাফ বা ঝুঁকি বলতে কী বোঝো?
আরোহ অনুমানে বিশেষ জ্ঞাত সত্য থেকে সামান্য অজ্ঞাত সত্যে উপনীত হওয়ার ক্ষেত্রে একরকম ফাঁক বা ঝুঁকি থেকে যায়। যেমন-বিশেষ কয়েকজন মানুষকে স্বার্থপর হতে দেখে সিদ্ধান্ত করা হল যে ‘সকল মানুষ হয় স্বার্থপর’। এক্ষেত্রে সকল মানষ যে স্বার্থপর তা যাচাই করা কারও পক্ষে সম্ভব নয়। তাই আশ্রয়বাক্য থেকে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার ক্ষেত্রে যে ফাঁক বা ব্যবধান থেকে যায় তাকে ‘আরোহমূলক লাফ’ বলা হয়। জন স্টুয়ার্ট মিল আরোহ অনুমানের এই ‘লাফ’-কে ‘অন্ধকারে ঝাঁপ দেওয়া’ বা ‘আরোহমূলক ঝুঁকি’ বলেছেন।
২। আরোহ অনুমানের মানদন্ডগুলি কী কী?
যেসব মানদণ্ডের উপর আরোহ অনুমানের সিদ্ধান্তের সম্ভাব্যতা নির্ভর করে সেগুলি হল-
দৃষ্টান্তের সংখ্যা: হেতুবাক্যে উল্লিখিত দৃষ্টান্তের সংখ্যা যত বেশি হবে, উপমাযুক্তির সিদ্ধান্তের সম্ভাব্যতাও তত বেশি হবে।
জ্ঞাত সাদৃশ্য: হেতুবাক্যে উল্লিখিত দৃষ্টান্তের মধ্যে জ্ঞাত সাদৃশ্যের সংখ্যা যত বেশি হবে, উপমাযুক্তির সিদ্ধান্তের সম্ভাব্যতাও তত বেশি হবে।
ব্যক্তিগত বৈসাদৃশ্য : হেতুবাক্যে উল্লিখিত দৃষ্টান্তসমূহের মধ্যে ব্যক্তিগত বৈসাদৃশ্য যত বেশি হবে সিদ্ধান্তের সম্ভাব্যতাও তত বেশি হবে।
সাদৃশ্যের প্রাসঙ্গিকতা: উপমাযুক্তির মূল্যায়নের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হল-সাদৃশ্যের প্রাসঙ্গিকতা। হেতুবাক্যে উল্লিখিত দৃষ্টান্তের সঙ্গে সিদ্ধান্তের দৃষ্টান্তের সাদৃশ্য প্রাসঙ্গিক হলে যুক্তির সিদ্ধান্ত অনেক বেশি সম্ভাব্য ও গ্রহণযোগ্য হবে। অপরদিকে সাদৃশ্যের বিষয় অপ্রাসঙ্গিক হলে যুক্তির সিদ্ধান্তের সম্ভাব্যতা কম হবে।
৩। বৈজ্ঞানিক আরোহ অনুমানের তিনটি বৈশিষ্ট্য লেখো।
বৈজ্ঞানিক আরোহ অনুমানের বৈশিষ্ট্য
বৈজ্ঞানিক আরোহ অনুমানের নিজস্ব কতকগুলি বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়, যেমন-
[1] প্রকৃত আরোহ অনুমানের বিশেষ রূপ: বৈজ্ঞানিক আরোহ অনুমান হল প্রকৃত আরোহ অনুমানের একটি বিশেষ প্রকার বা রূপ। এটি তথাকথিত আরোহ অনুমানের কোনো আকার বা প্রকার নয়। এটি কোনো অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নয়।
[2] কার্যকারণ নিয়মের ওপর গুরুত্ব আরোপ: বৈজ্ঞানিক আরোহ অনুমানে কার্যকারণ নিয়মের ওপর সবিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। বৈজ্ঞানিক আরোহ অনুমানের এই লক্ষণটিই তাকে অবৈজ্ঞানিক আরোহ অনুমান থেকে পৃথক করতে পারে।
[3] আরোহমূলক লাফ: বৈজ্ঞানিক আরোহ অনুমানের একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ বা বৈশিষ্ট্য হল ‘আরোহমূলক লাফ।’ এই আরোহমূলক লাফের সাহায্যেই আমরা বিশেষ বিশেষ কতকগুলি ঘটনাকে পর্যবেক্ষণ করে, একটি সামান্য সংশ্লেষক বচনে উপনীত হতে পারি।
৪। অপূর্ণগণনামূলক আরোহ অনুমান কাকে বলে? অবৈজ্ঞানিক আরোহকে লৌকিক আরোহ বলা হয় কেন?
যে আরোহ অনুমানে কার্যকারণ সম্পর্কের উপর নির্ভর না করে অবাধ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বিশেষ বচন থেকে সামান্য বচন প্রতিষ্ঠা করা হয় তাকে অবৈজ্ঞানিক আরোহ অনুমান বা অপূর্ণগণনামূলক আরোহ অনুমান বা লৌকিক আরোহ অনুমান বলে। যেমন-আমরা এই পর্যন্ত যত দাঁড়কাক দেখেছি সেগুলি সব কালো, অন্য কোনো রঙের দাঁড়কাক আমরা দেখিনি। এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত করা হল ‘সকল দাঁড়কাক হয় কালো’।
অবৈজ্ঞানিক আরোহ অনুমানে মুক্ত শ্রেণী, যেমন-মানুষ, ফুল, পাখি ইত্যাদি শ্রেণির কথা বলা হয়। মুক্ত শ্রেণির সভ্য সংখ্যা অসীম হওয়ায় সকল সভ্য গণনা করা কখনও সম্ভব নয়। সীমিত সংখ্যক সভ্যের গণনা বা পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে সার্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ফলে গণনা অপূর্ণ থেকে যায়। তাই অবৈজ্ঞানিক আরোহ অনুমানকে অপূর্ণগণনামূলক আরোহ অনুমান বলা হয়। যেমন- সীমিত সংখ্যক দাঁড়কাক কালো রঙের দেখে সিদ্ধান্ত করা হল যে ‘সকল দাঁড়কাক হয় কালো’। এক্ষেত্রে সকল দাঁড়কাককে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয়। তাই এটি অপূর্ণগণনামূলক আরোহ অনুমান।
আরো পড়ুন : উচ্চমাধ্যমিক চতুর্থ সেমিস্টার রাষ্ট্রবিজ্ঞান প্রশ্ন উত্তর