শিক্ষামনোবিজ্ঞান ফলিত মনোবিজ্ঞানের একটি শাখা। শিক্ষাক্ষেত্রে মনোবিজ্ঞানের প্রয়োগকেই শিক্ষামনোবিজ্ঞান বলে। এখানে ব্যক্তির শিক্ষাকালীন আচরণের বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণ, নিয়ন্ত্রণ ও পূর্বাভাস দেওয়া হয়।
শিক্ষামনোবিজ্ঞানের সংজ্ঞা
কয়েকজন প্রখ্যাত শিক্ষামনস্তত্ববিদের দেওয়া শিক্ষামনোবিজ্ঞানের সংজ্ঞার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।
(1) স্যান্ডিফোর্ড প্রদত্ত সংজ্ঞা:
অধ্যাপক স্যান্ডিফোর্ড (Sandiford)-এর মতে, শিক্ষামনোবিজ্ঞান ফলিত মনোবিজ্ঞানের একটি শাখা, যা মনোবিজ্ঞানের নীতিগুলিকে শিক্ষাক্ষেত্রে প্রয়োগ করে।
(2) জাড় প্রদত্ত সংজ্ঞা:
জাড় (Judd) বলেন, ব্যক্তির জন্ম থেকে প্রাপ্তবয়স পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের বিকাশের বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনাই হল শিক্ষামনোবিজ্ঞান (Educational psychology may be defined as the science which describes and explains the changes that take place in individuals, as they pass through various stages of development from birth to maturity)।
(3) কোলেস্মিক প্রদত্ত সংজ্ঞা:
কোলেস্নিক (Kolesnick)-এর মতে, মনোবিজ্ঞানের যে শাখা শিক্ষাপ্রক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করায় এবং তার উন্নতিসাধনে সাহায্য করে, তারই বিশদ আলোচনা হল শিক্ষামনোবিজ্ঞান।
(4) বার্নার্ড প্রদত্ত সংজ্ঞা:
বার্নার্ড (Bernard)-এর মতে, শিক্ষামনোবিজ্ঞান হল মনোবিজ্ঞানের একটি শাখা, যা শিক্ষা ও শিখনপ্রক্রিয়া (বিশেষ করে বিদ্যালয় প্রভৃতি সামাজিক প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক) নিয়ে আলোচনা করে।
শিক্ষামনোবিজ্ঞানের লক্ষ্য
শিক্ষামনোবিজ্ঞানের সাধারণ লক্ষ্য হল শিক্ষককে তার পেশাগত ও সাংস্কৃতিক উদ্দেশ্যপূরণের জন্য সংগঠিত তথ্য সরবরাহ করা। এই সাধারণ লক্ষ্যকে বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যের কথা উল্লেখ করা যায়, যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নীচে বর্ণিত হল।
(1) শিশুর বিকাশে সহায়তা:
শিক্ষা মনোবিজ্ঞান একজন শিক্ষককে বুঝতে সাহায্য করে যে, শিশুর বিকাশে, বিষয়বস্তু আয়ত্তীকরণে, উন্নত সামাজিক আচরণ এবং সুসংহত ব্যক্তির বিকাশে শিক্ষকের বিশেষ ভূমিকা আছে।
(2) শিক্ষার উদ্দেশ্য নির্ধারণ:
শিক্ষণের ফলে বাঞ্ছিত আচরণ নির্দিষ্টকরণে অর্থাৎ শিক্ষার উদ্দেশ্য নির্ধারণে সাহায্য করা।
(3) শিশুর প্রতি নিরপেক্ষ এবং সহানুভূতিশীল হওয়া:
শিশুদের প্রতি নিরপেক্ষ এবং সহানুভূতিশীল মনোভাব গঠন করতে সাহায্য করা, যাতে নৈর্ব্যক্তিকভাবে তাদের আচরণ বিচার করা যায়।
(4) সামাজিকীকরণ:
সামাজিক সম্পর্কের প্রকৃতি এবং গুরুত্ব ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করা শিক্ষামনোবিজ্ঞানের অন্যতম লক্ষ্য। শিশুদের মধ্যে বিভিন্ন সামাজিক কার্যাবলি, যেমন-অন্যান্যদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলা, দলগত কাজে অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা করা ইত্যাদি অভ্যাস গড়ে তুলতে সঠিক পদ্ধতি অবলম্বন করা এক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
(5) শিক্ষাদানের সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে তথ্যসরবরাহ:
শিক্ষাদানে যেসব সমস্যা দেখা যায় তার সমাধানের জন্য তথ্য ও নীতি সরবরাহ করা শিক্ষামনোবিজ্ঞানের আর-একটি লক্ষ্য। যেমন-পাঠদানের উপাদানগুলি কীভাবে নির্বাচিত ও সংগঠিত করলে সমস্যার সমাধান সহজ হয়, প্রত্যাশিত ফলের জন্য কীভাবে উপাদানগুলিকে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ব্যবহার করা যেতে পারে ইত্যাদি।
(6) শিখনপ্রক্রিয়াকে সামগ্রিকভাবে বোঝা:
শিখনপ্রক্রিয়াটিকে সামগ্রিক এবং পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বোঝার জন্য যে পশ্চাৎপটের প্রয়োজন হয় তার ব্যবস্থা করা এক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যেমন- প্রয়োজনীয় উপাদান কোম্পুলি এবং কীভাবে তা সংগ্রহ করা যায় সে সম্পর্কে জ্ঞান, উপাদানগুলিকে কত সুন্দরভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে ও তার জন্য প্রাপ্ত ফলের মূল্যায়নের জন্য নির্ভরযোগ্য ও যথার্থ পদ্ধতি ব্যবহার করা ইত্যাদি।
(7) আচরণ বিশ্লেষণ:
শিক্ষামনস্তত্ব শিক্ষককে তাঁর নিজের এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষাকালীন আচরণ বিশ্লেষণ করতে প্রয়োজনীয় তথ্য ও কৌশল সরবরাহ করে, যা অবশেষে শিক্ষার্থীর সংগতিবিধানে সহায়ক হয় এবং শিক্ষার্থীদের সুসংহত ব্যক্তিত্ব বিকাশে সাহায্য করে।
(8) শিক্ষাদান পদ্ধতি:
প্রগতিশীল শিক্ষাদান পদ্ধতি, নির্দেশনা কর্মসূচি এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংগঠন ও প্রশাসনের ব্যাখ্যা এবং তাকে কার্যকরী করা ও স্থায়ী রূপ দেওয়ার কাজে শিক্ষককে সাহায্য করা শিক্ষামনোবিজ্ঞানের অন্যতম লক্ষ্য।
শিক্ষামনোবিজ্ঞানে ব্যবহৃত পদ্ধতি
শিক্ষামনোবিজ্ঞানে যেসব পদ্ধতি ব্যবহৃত হয় সেগুলির মধ্যে রয়েছে-
(1) অন্তর্দর্শন:
যে কৌশলের সাহায্যে ব্যক্তি নিজের অনুভূতি, চিন্তা, প্রেরণা প্রভৃতি মানসিক প্রক্রিয়াগুলি পাঠ করে তাকে অন্তর্দর্শন পদ্ধতি বলে। এই পদ্ধতি মনোবিজ্ঞান এবং তার শাখাগুলির ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়। মানসিক প্রক্রিয়াগুলির ওপর বাহ্যিক পরীক্ষণ এবং পর্যবেক্ষণ যথেষ্ট নয়। কোন্ বিশেষ মানসিক অবস্থায় কোনো ব্যক্তির মনে কী ধরনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ঘটছে, তা সেই ব্যক্তিই বলতে পারে। ব্যক্তির নিজস্বতা অন্তর্দর্শনের মাধ্যমেই প্রকাশ পায়।
(2) পর্যবেক্ষণ:
কোনো অভিজ্ঞ এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তি যখন কোনো উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে শিক্ষার্থীর শিক্ষাকালীন আচরণ প্রত্যক্ষণ করেন এবং মন্তব্য করেন, তখন তাকে পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি বলে। এটি একটি বহুল প্রচলিত পদ্ধতি। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষা, শিখনপ্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীর ভূমিকা, শিক্ষক বা সহপাঠীদের প্রতি তার আচরণ বা কোনো শিক্ষামূলক কর্মসূচিতে তার উৎকর্ষ এবং সহপাঠীদের সঙ্গে আচার-আচরণের প্রকৃতি সম্পর্কে জানার জন্য এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এখানে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীর আচরণ পর্যবেক্ষণ করা হয় বলে এই পদ্ধতি অনেক নির্ভরযোগ্য। এটি ব্যক্তিগত পদ্ধতি হলেও আধুনিক প্রযুক্তি এবং অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সহযোগিতায় একে নৈর্ব্যক্তিক করে তোলা সম্ভব। পর্যবেক্ষণ নানা প্রকারের হতে পারে, যেমন-প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ, স্বাভাবিক এবং কৃত্রিম, পূর্বনির্ধারিত এবং পূর্বনির্ধারিত নয়।
(3) চিকিৎসামূলক পদ্ধতি:
চিকিৎসামূলক পদ্ধতি সাধারণত ব্যবহৃত হয় অপসংগতিমূলক এবং ব্যতিক্রমী শিক্ষার্থীদের আচরণ-সম্পর্কিত সমস্যার তথ্যসংগ্রহে। অপসংগতি বিভিন্ন প্রকৃতির হতে পারে, যেমন অসামাজিক আচরণ, আবেগ সংক্রান্ত বিশৃঙ্খল আচরণ, শিখন সংক্রান্ত সমস্যা, বিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিষয়ে পিছিয়ে থাকা ইত্যাদি। চিকিৎসামূলক পদ্ধতির উদ্দেশ্য হবে ব্যক্তির অবচেতন মনে প্রবেশ করে অপসংগতির কারণ অনুসন্ধান এবং সম্ভাব্য চিকিৎসার সুপারিশ করা। এই ধরনের চিকিৎসায় পর্যবেক্ষণ, সাক্ষাৎকার, শারীরিক চিকিৎসা এবং এর পাশাপাশি বুদ্ধি, ব্যক্তিত্ব, প্রবণতা, আগ্রহ ইত্যাদি সম্পর্কিত তথ্যসংগ্রহে বিভিন্ন রকমের অভীক্ষা এবং কৌশল ব্যবহার করা হয়।
(4) পরীক্ষণমূলক পদ্ধতি:
মানব আচরণকে বিজ্ঞানভিত্তিক ও নৈর্ব্যক্তিকভাবে অধ্যয়ন করার জন্য মনস্তত্ত্ববিদদের নিরন্তর প্রয়াসের ফলই হল পরীক্ষণমূলক পদ্ধতি। আচরণকে বোঝা, নিয়ন্ত্রণ করা ও পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য পরীক্ষণমূলক পদ্ধতির বিকাশ আচরণবাদী মনোবিজ্ঞানের অন্যতম অবদান। পরীক্ষণমূলক পদ্ধতি হল সবচেয়ে নিখুঁত, পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক। অধিকাংশ মনোবিদের মতে, কেবল পরীক্ষার সাহায্যে নিয়ন্ত্রিত পর্যবেক্ষণ, উপাদানের পরিবর্তন, সঠিক সংখ্যায়ন এবং ‘হাইপোথিসিস’ বা প্রকল্পকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। পরীক্ষণ পদ্ধতিতে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল পরীক্ষণের নকশাকরণ (Experimental design)। পরীক্ষণ নকশা বলতে বোঝায় গবেষক পরীক্ষাটি কীভাবে পরিচালিত করবেন, তার রূপরেখা। শক্তিশালী নকশার ওপর গবেষকের কাজের উৎকর্ষ নির্ভর করে। বর্তমান গবেষকগণ বিভিন্ন রকমের নকশার কথা উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে শ্রেণিকক্ষে ব্যবহৃত হয় এমন কয়েকটি নকশার কথা উল্লেখ করা হল-
[i] এক দল নকশা: এটি হল সবচেয়ে সরল নকশা। একে অনেক সময় প্রাক্-পরীক্ষণ নকশা (Pre- experimental design)-ও বলে। এখানে একটি দল থাকায় তুলনার প্রশ্ন নেই। উদাহরণস্বরূপ, একজন শিক্ষক ধূমপানের অভ্যাস দূর করার জন্য দশটি ছাত্রের ওপর কিছু প্রয়োগ করেন। তিন মাস পরে দেখা গেল দশটির মধ্যে ছ-টি ছাত্র ধূমপান ছেড়ে দিয়েছে।
[ii] এক দল প্রাক্-অভীক্ষা এবং অভীক্ষা অন্তের নকশা: এখানে গবেষক পূর্বনির্দিষ্ট কোনো কিছু পড়ানোর আগে ছাত্রদের পরীক্ষা করেন। পাঠদানের পরে আবার পরীক্ষা করেন। এই দুটি পরীক্ষার মধ্যে যে পার্থক্য তাই হল পূর্বনির্দিষ্ট পাঠ প্রয়োগের ফল। উদাহরণস্বরূপ, শিক্ষামনোবিজ্ঞানের ওপর পাঠদানের পূর্বে শিক্ষার্থীর ওপর শিক্ষামনোবিজ্ঞানের অভীক্ষা প্রয়োগ করা হল। তিন মাস পাঠদানের পর আবার শিক্ষামনোবিজ্ঞানের অভীক্ষা প্রয়োগ করা হল। ওই দু-বার প্রয়োগের মধ্যে যে পার্থক্য তার কারণ হল তিন মাস ধরে শিক্ষামনোবিজ্ঞানের পাঠদান।
[iii ] দুই দল নকশা: এখানে দুটি সদৃশ বা একরকম দল বাছাই করা হয়। এক দলের ওপর পূর্বনির্দিষ্ট অভীক্ষা প্রয়োগ করা হয়। এই দলকে বলা হয় পরীক্ষণমূলক দল (Experimental Group)। অন্যদলের ওপর তা প্রয়োগ করা হয় না। একে বলা হয় নিয়ন্ত্রিত দল (Controlled Group)। একইরকম দল গঠনে একাধিক
কৌশল ব্যবহার করা হয়, যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হল-[a] এলোমেলো পদ্ধতিতে দল গঠন করা (Random method), [b] সব দিক থেকে একইরকম দল গঠন করা (Matched group)|
(5) ক্রমবিকাশমূলক পদ্ধতি:
দৈহিক, মানসিক, প্রাক্ষোভিক ইত্যাদি বিভিন্ন দিকে শিক্ষার্থীর ধারাবাহিক বিকাশ সম্পর্কে অবহিত হতে এই পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়, দুভাবে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় লম্বালম্বিভাবে (Longitudinal) এবং আড়াআড়িভাবে (Cross sectional)। প্রথম ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট শিশুকে দীর্ঘসময় ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং দ্বিতীয় ক্ষেত্রে বিভিন্ন বয়সের শিশুদের একই সময়ে পর্যবেক্ষণ করা হয়।
(6) পরিসংখ্যান পদ্ধতি:
শিক্ষামনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে গভীরভাবে জানতে পরিসংখ্যান শাস্ত্রের প্রয়োগ করা হয়। শিক্ষামূলক গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যগুলি বিশ্লেষণ করা, গবেষণার প্রকল্পগুলিকে বিচার করা, সিদ্ধান্তগ্রহণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে পরিসংখ্যান পদ্ধতি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। পরিসংখ্যান পদ্ধতির ব্যবহারের ফলে শিক্ষাশ্রয়ী পরিসংখ্যান নামে একটি নতুন বিজ্ঞানের সৃষ্টি হয়েছে।
(7) তুলনামূলক পদ্ধতি:
প্রাণী হিসেবে মানুষ সবচেয়ে জটিল। এই জটিল মানুষের ওপর পরীক্ষানিরীক্ষা করা সবসময় সম্ভব হয় না, কারণ প্রয়োজনমতো মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। তা ছাড়া নিম্নতর প্রাণী যতটা সহজলভ্য এবং পরীক্ষণযোগ্য, মানুষ ততটা নয়। এজন্য শিক্ষামনোবিদরা অনেক ক্ষেত্রে নিম্নতর প্রাণীর ওপর পরীক্ষা করে মানুষের ওপর তার প্রয়োগযোগ্যতা বিচার করে থাকেন। উদাহরণস্বরূপ, শিখনের ওপর গবেষণা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিম্নতর প্রাণীদের ওপর করা হচ্ছে। তারপর মানুষের ওপর এর প্রয়োগের সম্ভাবনা বিচার করা হয়েছে।
(8) আন্তঃক্রিয়া বিশ্লেষণ পদ্ধতি:
সাম্প্রতিককালের শ্রেণিশিক্ষণে শিক্ষক ও ছাত্র কী পরিমাণে শিক্ষা-শিখন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেছে, কতক্ষণ কোন্ পক্ষ কথা বলেনি প্রভৃতি জানার জন্য শিক্ষাক্ষেত্রে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এই পদ্ধতির সাহায্যে সংগৃহীত তথ্য থেকে শ্রেণিকক্ষের আবহাওয়া, শিক্ষণপ্রক্রিয়া গণতান্ত্রিক না একপেশে ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা যায়।
শিক্ষামনোবিজ্ঞানের পরিধি
শিক্ষামনোবিজ্ঞানের পরিধি বলতে মনোবিজ্ঞানের শাখার আলোচ্য বিষয়গুলিকে বোঝায়। শিক্ষামনোবিদরা বিভিন্ন দিক থেকে এই পরিধিকে ব্যাখ্যা করেছেন যা নীচে উল্লেখ করা হল।
(1) সহজাত মানসিক সামর্থ্য:
ব্যক্তি সহজাতভাবে কিছু মানসিক সামর্থ্য নিয়ে পৃথিবীতে আসে। যেমন-বুদ্ধি, প্রক্ষোভ, স্মৃতি, কল্পনা, চিন্তন ইত্যাদি। শিক্ষার ক্ষেত্রে এই সামর্থ্যগুলি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এগুলি সম্পর্কে বিশদ জ্ঞান অর্জন ছাড়া কীভাবে এদের নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নতকরণ করা যায় এবং শিক্ষাব্যবস্থার ওপর সার্থক প্রয়োগ করা যায় তা জানা সম্ভব নয়। তাই শিক্ষামনোবিজ্ঞানে এই সহজাত সামর্থ্যগুলি সম্পর্কে বিশদ আলোচনা থাকে।
(2) জীবনবিকাশের ধারা:
শিশুর জন্মগতসূত্রে প্রাপ্ত সামর্থ্যগুলি পুষ্টি, অনুশীলন এবং পরিবেশের সঙ্গে ক্রিয়া- প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিকাশ লাভ করে। এই বিকাশের যেমন একটি ধারা আছে, তেমনই আছে অনুকূল পরিবেশ রচনার ধারাও। শিক্ষামনোবিজ্ঞান শিশুর দৈহিক, মানসিক, প্রাক্ষোভিক বিকাশের ধারাগুলি আলোচনা করে এবং শিশুর সুষ্ঠু বিকাশের জন্য যে পরিবেশের প্রয়োজন তার রূপরেখাও শিক্ষামনোবিজ্ঞানে আলোচিত হয়।
(3) ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য:
ব্যক্তিগত পার্থক্য একটি স্বাভাবিক ঘটনা। ব্যক্তিগত পার্থক্যের কারণ কী, কীভাবে এই পার্থক্যকে ভিত্তি করে শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলি, যেমন পাঠক্রম, শিক্ষাদান পদ্ধতি, মূল্যায়ন প্রভৃতির বিচারবিবেচনা করা যায় তার আলোচনা শিক্ষামনোবিজ্ঞানের পরিধির অন্তর্ভুক্ত।
(4) শিখনতত্ত্ব:
শিখনের তত্ত্ব এবং তার প্রয়োগ শিক্ষামনোবিদ্যার অন্যতম আলোচ্য বিষয়। গতানুগতিক শিখনের পদ্ধতি হিসেবে উদ্দীপক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে আধুনিক অপেক্ষাকৃত জটিল আচরণমূলক ও জ্ঞানমূলক তত্ত্ব শ্রেণিশিখনে অধিকতর কার্যকরী বলে প্রমাণিত হয়েছে। জ্ঞানমূলক তত্ত্বে শিখনকে নির্মাণভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যা শিক্ষা-শিখন প্রক্রিয়ার মধ্যে আমূল পরিবর্তন এনেছে।
(5) শিখনের ভিত্তি:
শিখনের ভিত্তিকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়-জ্ঞানমূলক এবং অনুভূতিমূলক। বুদ্ধি, স্মৃতি এবং মনোযোগ জ্ঞানমূলক ভিত্তির অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে প্রেরণা, মনোভাব এবং আগ্রহ অনুভূতিমূলক ভিত্তির অন্তর্ভুক্ত। অর্জিত জ্ঞান, ও অভিজ্ঞতা স্মৃতিতে সঞ্চিত হয়, প্রয়োজনবোধে যা আমরা স্মরণ করে প্রয়োগ করি। সঞ্চিত অভিজ্ঞতার সঙ্গে নতুন জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সমন্বয় সাধন করাই হল শিখন। তাই শিক্ষককে জানতে হবে কীভাবে পাঠল বিষয় স্মৃতিতে সঞ্চিত হয় এবং কীভাবে এই সঞ্চয়ের বিলোপ ঘটলে পূর্বপঠিত বিষয়কে আমরা ভুলে যাই। স্মৃতি ছাড়া অন্যান্য জ্ঞানমূলক উপাদান, যেমন বুদ্ধি ও মনোযোগ এবং প্রেরণা, মনোভাব ও আগ্রহ প্রভৃতি শিখনের অনুভূতিমূলক উপাদানগুলি সম্পর্কে বিশদ তথ্য না জানলে উন্নত পাঠদানে শিক্ষকের ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
(6) শিক্ষাপ্রযুক্তি:
শিক্ষাপ্রযুক্তি কাকে বলে, কী ধরনের প্রযুক্তি শিক্ষাক্ষেত্রে কার্যকরী, কীভাবে শিক্ষাক্ষেত্রে প্রযুক্তির প্রয়োগ করা যায়-এসবই বর্তমানে শিক্ষামনোবিদ্যার গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।
(7) শ্রেণি ব্যবস্থাপনা:
সম্প্রতি শ্রেণি ব্যবস্থাপনা শিক্ষামনোবিদ্যার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। শিক্ষা-শিখন প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকরী করে তুলতে শ্রেণিকক্ষে উদ্ভূত বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে শ্রেণি ব্যবস্থাপনার কৌশল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
(8) পরীক্ষা ও মূল্যায়ন:
শিক্ষাপ্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর হল পরীক্ষা ও মূল্যায়ন। শিক্ষাকার্যক্রমের মধ্যে দিয়ে শিক্ষার্থী কতটুকু শিখল, প্রত্যাশিত মানে পৌঁছোতে সক্ষম হল কি না, না হলে কোথায় তার অসুবিধা, সেই অসুবিধা দূর করতে কী ধরনের সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় প্রভৃতি শিক্ষামনোবিদ্যার আলোচ্য বিষয়।
(9) প্রতিভাসম্পন্ন ও পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থী:
প্রতিভাসম্পন্ন এবং পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের কীভাবে নির্দিষ্ট করা যায়, কী তাদের মনস্তত্ত্ব, কী ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা তাদের জন্য উপযুক্ত, কেমন করেই বা তাদের শেখানো যাবে প্রভৃতি বিষয়ে চিন্তাভাবনা গণতান্ত্রিক এবং কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের পক্ষে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এটি শিক্ষামনোবিজ্ঞানে বিশদভাবে আলোচিত হয়।
(10) পরিসংখ্যান:
বিজ্ঞানের সমস্ত ক্ষেত্রে রাশিবিজ্ঞানের প্রয়োগ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বস্তুত রাশিবিজ্ঞানের জ্ঞান ছাড়া শিক্ষার্থীদের অগ্রগতির সঠিক মূল্যায়ন সম্ভব নয়। তাই একজন শিক্ষকের পক্ষে পরিসংখ্যানের প্রয়োজনীয় জ্ঞান অপরিহার্য।
(11) মানসিক স্বাস্থ্য:
মানসিক সুস্বাস্থ্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের পক্ষে প্রয়োজন। অন্যথায় শিখন বা শিক্ষা কোনোটিই সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয় না। মানসিক স্বাস্থ্য কী, সুস্থ মানসিক স্বাস্থ্যের লক্ষণগুলি কী, কীভাবে সুস্থ মানসিক স্বাস্থ্যের অধিকারী হওয়া যায়, অপসংগতি কী, এর কারণ কী, অপসংগতি প্রতিকার ও প্রতিরোধে কী ধরনের কর্মসূচি বিদ্যালয়ে নেওয়া যেতে পারে-এসবই শিক্ষামনোবিদ্যার আলোচ্য বিষয়।
(12) অভিযোজন প্রক্রিয়া:
সার্থক অভিযোজনই হল শিক্ষার লক্ষ্য। অভিযোজন কাকে বলে, কীভাবে অভিযোজন করা যায়, অভিযোজনের অনুকূল এবং প্রতিকূল পরিবেশ কী, অভিযোজনের অনুকূল পরিবেশ গড়ে তোলা এবং প্রতিকূল পরিবেশকে প্রতিরোধ করাও শিক্ষামনোবিদ্যার আলোচ্য বিষয়।
(13) শিক্ষানির্দেশনা:
শিক্ষানির্দেশনা কাকে বলে, শিক্ষানির্দেশনার আলোচ্য বিষয়, কীভাবে শিক্ষার্থী সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করা যায়, কীভাবে শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা পরিকল্পনা রচনা করা হয়, বৃত্তি পছন্দ কাকে বলে, কীভাবে এর বিকাশ হয়, এক্ষেত্রে শিক্ষকের করণীয় কী, কীভাবে তার বিস্তার করা সম্ভব প্রভৃতি সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য শিক্ষা ও বৃত্তিনির্দেশনার অন্তর্ভুক্ত হয়।
শিক্ষামনোবিজ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা (Needs of Educational Psychology)
সংকীর্ণ অর্থে শিক্ষা হল নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে আচরণের সংশোধন। আর শিক্ষামনোবিজ্ঞান হল ব্যক্তির শিক্ষাকালীন আচরণের বিজ্ঞান। শিক্ষাকে কার্যকরী করে তুলতে তাই শিক্ষামনোবিজ্ঞানের ভূমিকা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আচরণের বিজ্ঞান সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান না থাকলে আচরণ সংশোধনের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। সফল চিকিৎসক হতে গেলে যেমন পেশাগত জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করা প্রয়োজন, তেমনই একজন সফল শিক্ষক হতে গেলে আচরণ সম্পর্কিত জ্ঞান ও তার নিয়ন্ত্রণ এবং পূর্বাভাসের দক্ষতা অর্জন আবশ্যিক। কীভাবে শিক্ষামনোবিজ্ঞান শিক্ষাকে কার্যকরী ও সফল হতে সাহায্য করে তা আলোচনা করা হল। শিক্ষামনোবিজ্ঞান শিক্ষাকে দুভাবে সাহায্য করে থাকে- তাত্ত্বিক প্রয়োগের দ্বারা এবং ব্যাবহারিক প্রয়োগের দ্বারা।
শিক্ষামনোবিদ্যার তাত্ত্বিক প্রয়োগ
শিক্ষামনোবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক প্রয়োগ সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়গুলি নীচে আলোচনা করা হল-
(1) ব্যক্তির বিকাশ সম্পর্কীয় তথ্য:
শৈশব, বাল্যকাল, বয়ঃসন্ধিক্ষণ-জীবনবিকাশের এই স্তরগুলি সব শিক্ষার্থীই অতিক্রম করে। এই স্তরগুলির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে। শিক্ষার্থীর বিভিন্ন স্তরের বৈশিষ্ট্যাবলি জানা থাকলে শিক্ষকের পক্ষে শিক্ষাদানের কাজটি সহজ হয়।
(2) শ্রেণিকক্ষের শিখন সম্পর্কে জ্ঞান:
শিক্ষামনস্তত্ব থেকে সাধারণভাবে শিখনপ্রক্রিয়া এবং বিশেষভাবে শ্রেণিশিখনের প্রকৃতি ও তত্ত্ব সম্পর্কে জানা যায়। আমরা জানতে পারি শিখনের নীতি, শিখন সমস্যা ও তার প্রতিকার, শিখনপ্রক্রিয়া সম্পর্কে বিভিন্ন মতবাদ, কোন্ কোন্ উপাদান শিখনের ওপর প্রভাব বিস্তার করে এবং শিক্ষানির্দেশনা প্রভৃতি বিষয় সম্পর্কে। এ সবই শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
(3) ব্যক্তিগত পার্থক্য:
শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যক্তিগত পার্থক্য একটি স্বাভাবিক ঘটনা। ব্যক্তিগত পার্থক্যের কারণ জানা, ব্যক্তিগত পার্থক্যকে ভিত্তি করে শিক্ষার্থীর শিক্ষা-পরিকল্পনা রচনা করা এবং শিক্ষার্থীর সম্ভাবনাগুলির পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য অনুকূল পরিবেশ গঠন করা- সবই শিক্ষামনস্তত্বের সাহায্যে সম্ভব।
(4) কার্যকরী শিক্ষাপদ্ধতি:
শিক্ষামনস্তত্ব উপযুক্ত শিক্ষাপদ্ধতি নির্বাচনে সাহায্য করে। শিক্ষণীয় বিষয়বস্তু, শিক্ষার্থীদের বয়স ও মেধা, শিক্ষার উপকরণের সুযোগসুবিধা প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয় শিক্ষণপদ্ধতি নির্বাচনে শিক্ষককে সাহায্য করে। নতুন শিক্ষাপদ্ধতি ব্যবহার বা গতানুগতিক শিক্ষাপদ্ধতিকে প্রয়োজনমতো সংশোধনের পর তার ব্যবহার ইত্যাদি ক্ষেত্রে শিক্ষামনস্তত্ত্বের জ্ঞান শিক্ষকের পক্ষে বিশেষ প্রয়োজন।
(5) শিক্ষার্থীর সমস্যা:
শিক্ষামনোবিদ্যা পাঠ করে শিক্ষার্থীর বিভিন্ন বয়সের সমস্যাগুলি সম্পর্কে অবহিত হওয়া যায়। সমস্যাগুলি বিশ্লেষণ করে তার কারণ ও সমাধানের পথ ভালোভাবে নির্ধারণ করা যায়। এইভাবে শিক্ষামনোবিদ্যা শিক্ষার্থীর সমস্যা ও তার সমাধানে শিক্ষককে সাহায্য করে।
(6) মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে জ্ঞান:
শিক্ষা-শিখন ক্ষেত্রে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়কেই মানসিক সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে হবে, না হলে শিক্ষা কার্যক্রমটি প্রত্যাশিত মানে পৌঁছোবে না। শিক্ষামনোবিজ্ঞান থেকে জানা যায় যে, মানসিক সুস্বাস্থ্যের শর্তাবলি কী অর্থাৎ কীভাবে মানসিক সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হওয়া যায়, কী কী কারণে মানসিক স্বাস্থ্যের হানি হতে পারে, এর ফলে শিক্ষায় কী প্রভাব দেখা যায়, কীভাবেই বা এর প্রতিকার ও প্রতিরোধ করা সম্ভব ইত্যাদি। শিক্ষক যেমন শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য গঠনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা অবলম্বন করবেন, তেমনই নিজের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষার ব্যাপারেও সচেতন হবেন। শিক্ষামনোবিজ্ঞানের জ্ঞানই শিক্ষককে এ ব্যাপারে সাহায্য করে।
(7) নির্দেশনা:
শিক্ষা একটি জটিল প্রক্রিয়া। একে সফল এবং কার্যকরী করে তুলতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক সকলকেই বিশেষ কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। এই কর্মসূচির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল নির্দেশনা, বিশেষ করে শিক্ষা ও বৃত্তি নিদের্শনা। শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষাজীবনে বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হয়, যেমন-পড়াশোনায় মন দিতে না পারা, কোনো বিশেষ পাঠ্যবিষয়ে দুর্বলতা, সহপাঠীদের সঙ্গে তিক্ত সম্পর্ক, ধৈর্যহীনতা, নির্দিষ্ট পাঠক্রম বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে না পারা ইত্যাদি। এইসব ক্ষেত্রে শিক্ষানির্দেশনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই শিক্ষককে নির্দেশনা সম্পর্কে তাত্ত্বিক জ্ঞান অবশ্যই অর্জন করতে হবে। শিক্ষামনোবিদ্যা শিক্ষককে এই জ্ঞান সরবরাহ করে।
(8) শিক্ষার উদ্দেশ্য স্থিরীকরণ:
শিক্ষার উদ্দেশ্য স্থিরীকরণে শিক্ষামনোবিদ্যার ভূমিকা লক্ষণীয়। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীর চাহিদা ও সামর্থ্যের পরিবর্তন ঘটে। এর সঙ্গে সংগতি রেখে শিক্ষার উদ্দেশ্য স্থির করলে তা নৈর্ব্যক্তিক ও বাস্তবসম্মত হয়। বয়সভিত্তিক চাহিদা ও সামর্থ্য সম্পর্কে তথ্য শিক্ষামনোবিদ্যা থেকে পাওয়া যায়।
(9) পাঠক্রম রচনা:
বিভিন্ন বয়সের শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠক্রম রচনার ক্ষেত্রে মনোবিদ্যার নীতি সম্পর্কে জ্ঞান বিশেষভাবে প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের চাহিদা, তাদের বিকাশের প্রকৃতি, শিখনপ্রক্রিয়া এবং সামাজিক চাহিদা ইত্যাদি সবই পাঠক্রম রচনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বর্তমানে পাঠক্রম রচনায় এমনভাবে ব্যক্তিগত ও সামাজিক চাহিদার সমন্বয় ঘটানো হয়, যাতে বিদ্যালয় পরিবেশ থেকে সামাজিক পরিবেশে সঞ্চলন সঠিক পরিমাণে ঘটে।
(10) গবেষণা:
শিক্ষার্থীদের আচরণ এবং পারদর্শিতার ওপর প্রভাবসৃষ্টিকারী উপাদানগুলিকে পরিমাপ করার জন্য বিভিন্ন উপায় ও কৌশল প্রস্তুতিতে শিক্ষামনোবিদ্যা বিশেষভাবে সাহায্য করে। তা ছাড়া, শিখন এবং শিখনের ওপর প্রভাবসৃষ্টিকারী বিভিন্ন মানসিক প্রক্রিয়ার ওপর গবেষণা শিক্ষামনোবিজ্ঞানকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
(11) ব্যতিক্রমী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা:
ব্যতিক্রমী শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা ও নির্দেশনার ক্ষেত্রে শিক্ষামনোবিদ্যার ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
(12) ধনাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি গঠন:
শিক্ষা, শিক্ষালয় তথা শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সমস্ত বিষয়ের প্রতি ধনাত্মক বা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গঠন করা শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের পক্ষেই বিশেষ প্রয়োজন। এই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে শিক্ষামনোবিদ্যা বিশেষভাবে সাহায্য করে।
(13) দলীয় গতিশীলতা:
বর্তমান শিক্ষামনোবিদগণ শ্রেণিকক্ষে শিক্ষা-শিখন প্রক্রিয়ায় সামাজিক আচরণ এবং দলীয় গতিশীলতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। সফল শিক্ষক হতে গেলে এই বিষয়ে জ্ঞান অপরিহার্য।
শিক্ষামনোবিদ্যার ব্যাবহারিক প্রয়োগ
শিক্ষামনোবিজ্ঞানের ব্যাবহারিক প্রয়োগ সংক্রান্ত বিভিন্ন দিকগুলি হল-
(1) শৃঙ্খলার সমস্যা:
প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থায় শৃঙ্খলাভঙ্গের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান ছিল। বর্তমান শিক্ষামনোবিদরা এই ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিরোধী। তাঁরা বলেন, এতে বিপরীত প্রতিক্রিয়া হতে পারে। যে শিক্ষক শৃঙ্খলার জন্য কঠোর শাস্তি প্রয়োগ করেন, তাঁর ও তিনি যে বিষয়ে পাঠদান করছেন উভয়ের সঙ্গে শিক্ষার্থীর অবাঞ্ছিত সম্পর্ক তৈরি হয়।
(2) শিক্ষা-সহায়ক উপকরণের ব্যবহার:
শিক্ষামনোবিদ্যা গবেষণায় শিক্ষা-সহায়ক উপকরণগুলির কার্যকারিতা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এই উপকরণগুলি একদিকে যেমন শিক্ষার্থীকে জ্ঞান অর্জনে সাহায্য করে, অন্যদিকে তেমনই অতীত বিষয়কে দীর্ঘদিন স্মরণে রাখতে সাহায্য করে।
(3) গণতান্ত্রিক প্রশাসন:
বিদ্যালয় ও শ্রেণিকক্ষ পরিচালনায় অতীতের স্বেচ্ছাচারী প্রশাসন বর্তমানে গণতান্ত্রিক প্রশাসনের রূপ নিয়েছে। প্রশাসনিক সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট সকলের সঙ্গে আলোচনা করেই ব্যবস্থা নিতে হবে। এই ধরনের গণতান্ত্রিক প্রশাসন সমস্যাসমাধানের সর্বোৎকৃষ্ট উপায় বলে প্রমাণিত হয়েছে।
(4) সময়তালিকা:
বিদ্যালয়ের পাঠদানের সময়তালিকা কীভাবে প্রস্তুত করা হবে, কোন্ বিষয়ের পর কোন্ বিষয়ে পাঠদান করা হলে ভালো ফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে প্রভৃতি ব্যাপারে শিক্ষামনোবিদ্যা তথ্য সরবরাহ করে। এই তথ্যের ভিত্তিতে সময়তালিকাকে আরও বিজ্ঞানসম্মত করা যায়।
(5) সহপাঠক্রমিক কার্যাবলি:
শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য হল শিক্ষার্থীর সুসংহত ব্যক্তিত্বের বিকাশ। শুধু শ্রেণিকক্ষে পঠনপাঠনই সুসংহত ব্যক্তিত্ব বিকাশের পক্ষে যথেষ্ট নয়। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষাদানের পাশাপাশি খেলাধুলো, নাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে শিক্ষার্থী যাতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে, সে ব্যাপারে বিশেষ লক্ষ রাখতে হবে।
(6) নতুন চিন্তাধারার ব্যবহার:
শিক্ষা-শিখন প্রক্রিয়ার উন্নতি করতে নতুন নতুন চিন্তাধারার প্রয়োগ ঘটছে। ডাল্টন প্ল্যান, প্রজেক্ট পদ্ধতি, সক্রিয়তাভিত্তিক পদ্ধতি, আবিষ্কার পদ্ধতি, পরিকল্পনাভিত্তিক পদ্ধতি, অনুশিক্ষণ, সমন্বয়ী শিক্ষণপদ্ধতি প্রভৃতি এই নতুন চিন্তাধারার মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এই সব কিছুরই মূলে রয়েছে শিক্ষামনোবিদ্যা।
(7) পাঠ্যপুস্তক রচনা:
শিক্ষামনোবিদ্যা পাঠ্যপুস্তকের পরিকল্পনা রচনায় সাহায্য করে। বর্তমানে পাঠ্যপুস্তক লেখার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর বয়স, মানসিক বিকাশ, চাহিদা এবং আগ্রহ বিবেচিত হয়। পরিশেষে বলা যায়, বর্তমানে শিক্ষামনোবিদ্যা শিক্ষার সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেছে। শিক্ষামনোবিদ্যা ছাড়া শিক্ষাব্যবস্থা চিন্তা করা যায় না। শিক্ষামনোবিদ্যার ওপর নিত্যনতুন গবেষণা নতুন নতুন তথ্য ও তত্ত্ব নিয়ে আসছে, শিক্ষাক্ষেত্রে যার প্রয়োগ শিক্ষাকে গতিশীল এবং ক্রমশ উন্নত করে তুলছে।
আরও পড়ুন | Link |
ছুটি গল্পের বড় প্রশ্ন উত্তর | Click Here |
তেলেনাপোতা আবিষ্কার বড় প্রশ্ন উত্তর | Click Here |
আগুন নাটকের বড়ো প্রশ্ন উত্তর | Click Here |