রাষ্ট্রের প্রকৃতি বড়ো প্রশ্ন ও উত্তর একাদশ শ্রেণি ইতিহাস | Class 11 Second Semester History WBCHSE

সূচিপত্র

রাষ্ট্রের প্রকৃতি বড়ো প্রশ্ন ও উত্তর একাদশ শ্রেণি ইতিহাস | Class 11 Second Semester History WBCHSE

রাষ্ট্রের প্রকৃতি বড়ো প্রশ্ন ও উত্তর
রাষ্ট্রের প্রকৃতি বড়ো প্রশ্ন ও উত্তর

১। প্লেটোর রাষ্ট্রদর্শন সম্পর্কে আলোচনা করো

গ্রিক রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে প্লেটো (Plato)-র নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়। রাষ্ট্রদর্শন অনুধাবনের বিষয়ে সারা পৃথিবীর কাছে তিনি ছিলেন অন্যতম পথপ্রদর্শক। তাঁর হাত ধরেই রাষ্ট্রচিন্তা প্রথম সমন্বিত রূপ লাভ করে।

প্লেটোর রাষ্ট্রদর্শন

প্লেটোর শিক্ষাগুরু ছিলেন সক্রেটিস। তাঁর কাছ থেকেই প্লেটো লাভ করেছিলেন রাজনৈতিক জ্ঞানের মূলমন্ত্র- ‘সদ্‌গুণই হল জ্ঞান’-এর শিক্ষা।

আলোচনা পদ্ধতি

প্লেটো দর্শন আলোচনার কোনও নতুন পদ্ধতি সৃষ্টি করেননি। সংলাপধর্মী (Dialogue) যে বিচারবিশ্লেষণ পদ্ধতি তিনি গ্রহণ করেছিলেন, তা একান্তভাবেই সক্রেটিসের উদ্ভাবন। প্লেটোর বিখ্যাত গ্রন্থ The Republic -এইরূপ সংলাপধর্মী পদ্ধতিতে লেখা হয়েছে। তাছাড়া পিথাগোরাসের (Pythagoras) জ্যামিতিক সূত্র দ্বারাও প্লেটোর আলোচনা পদ্ধতি বিশেষভাবে প্রভাবিত ছিল। এর পাশাপাশি প্লেটো তাঁর তাত্ত্বিক আলোচনা ও বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে Deductive Method বা অবরোহ পদ্ধতিও গ্রহণ করেছিলেন।

রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কে মত

বিশিষ্ট গ্রিক দার্শনিক প্লেটো প্রধানত মানুষের নানা ধরনের প্রয়োজন মেটানোর চাহিদার (মূলত অর্থনৈতিক প্রয়োজনকে পরিতৃপ্ত করার উদ্দেশ্যে) প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রের উদ্ভবের বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন।

  1. জীবনের প্রয়োজনবোধ: প্লেটোর মতানুযায়ী, মানুষের জীবনে নানা ধরনের জিনিসের প্রয়োজন হয়, জীবনধারণের জন্য এদের গুরুত্ব অসীম। কিন্তু মানুষ এককভাবে বা বিচ্ছিন্নভাবে তার সব প্রয়োজন মিটিয়ে উঠতে পারে না।
  2. পারস্পরিকতা: প্লেটোর মতে, দুর্বলতা বা অসম্পূর্ণতা এবং দক্ষতা বা কর্মগুণের পারস্পরিক আদানপ্রদান (Reciprocity) সকলের জীবনের প্রয়োজন মেটাতে পারে। এই আদানপ্রদানভিত্তিক যৌথ জীবনধারার সাংগঠনিক রূপই হল রাষ্ট্র।
ন্যায়বিচার তত্ত্ব

The Republic গ্রন্থে প্লেটো ন্যায়বিচার তত্ত্বের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা উপস্থাপিত করেছেন। রাষ্ট্রের ধর্মই হল ন্যায়বিচার তথা সুবিচারের নীতিকে প্রতিফলিত করা- প্লেটোর রাষ্ট্রদর্শনে এইরূপ নৈতিক বিশ্বাসের পরিচয় মেলে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, প্রচলিত গ্রিক নগররাষ্ট্র এবং সমাজব্যবস্থার মধ্যেই প্লেটো ন্যায়বিচারের অনুসন্ধানে সচেষ্ট হয়েছেন।

আদর্শ রাষ্ট্রের ধারণা

বিশিষ্ট রাষ্ট্রচিন্তাবিদ প্লেটো কল্পনা করেছিলেন ন্যায়নির্ভর এক আদর্শ রাষ্ট্রের। দ্য রিপাবলিক গ্রন্থে একটি আদর্শ রাষ্ট্রের রূপরেখা তুলে ধরে তিনি বলেছেন যে, আদর্শ রাষ্ট্রের সকল সদস্য নিজেকে এক বৃহৎ পরিবারের অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করবে। এইরূপ রাষ্ট্রীয় পরিবারের মধ্যে সমষ্টিগত জীবনযাপনকে প্লেটো আদর্শ রাষ্ট্রের ভিত্তি বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি আরও দেখিয়েছেন যে, উৎপাদক, যোদ্ধা এবং শাসক বা অভিভাবক এই তিনটি শ্রেণির একত্রে অবস্থান এবং তাদের নিজ নিজ কর্তব্য পালনের মধ্য দিয়ে আদর্শ রাষ্ট্রের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটবে। এই তিন শ্রেণির কয়েকটি নৈতিক গুণ থাকা অবশ্যপ্রয়োজনীয় বলে প্লেটো মনে করতেন, যথা- মহত্ত্ব বা প্রজ্ঞা (wisdom), মিতাচার (temperance), সাহস (courage), ন্যায়পরায়ণতা (justice)।

শিক্ষাতত্ত্ব

ন্যায়নির্ভর ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের প্রয়োজনে এক উপযুক্ত শিক্ষাব্যবস্থার সন্ধানে ব্রতী হয়েছিলেন বিশিষ্ট চিন্তাবিদ প্লেটো। তাঁর The Rupublic গ্রন্থের দ্বিতীয়, তৃতীয় ও বিশেষভাবে সপ্তম অধ্যায়ে শিক্ষাতত্ত্ব বিষয়ে আলোচনা উপস্থিত। আদর্শ রাষ্ট্রে শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ শ্রেণির প্রাধান্য বা বংশভিত্তিক শিক্ষার বদলে রাষ্ট্রের প্রতিটি শিশুকে সর্বোচ্চ শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হবে বলে উল্লেখ করা হয়। তিনি শিক্ষাব্যবস্থাকে তিনটি স্তরে বিভক্ত করার কথা বলেন। প্রথম স্তরে যারা শিক্ষালাভ করবেন এবং পরীক্ষায় অকৃতকার্য হবেন তারা উৎপাদক শ্রেণিভুক্ত হবেন। দ্বিতীয় স্তরে যারা অকৃতকার্য হবেন তারা সেনাবাহিনীতে যোগদান করবেন এবং তৃতীয় অর্থাৎ সর্বোচ্চ স্তরে যারা সাফল্য লাভ করবেন, তারা শাসক হিসেবে পরিচিত হবেন- বিশেষত দার্শনিক শাসকরূপে তারা উন্নীত হবেন।

  1. প্রাথমিক শিক্ষা: প্রাথমিক শিক্ষার ২টি স্তর প্লেটোর শিক্ষাতত্ত্বে লক্ষণীয়, প্রথমটি হল ৬ বছর পর্যন্ত এবং দ্বিতীয়টি ১৮ বছর পর্যন্ত। এই পর্বে মূলত কল্পনাশক্তির বিকাশসাধনের জন্য শিক্ষাদান করা হবে বলে উল্লিখিত হয়।
  2. উচ্চতর শিক্ষা: উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও প্লেটো ১৮ ৫০ বছর পর্যন্ত বয়সিদের মধ্যে শিক্ষার বিস্তার ঘটানোর জন্য শিক্ষাকে বিভিন্ন স্তরে বিভাজিত করে আদর্শ রাষ্ট্রের উপযুক্ত শিক্ষাপ্রণালীর নকশা প্রস্তুত করেছেন। প্লেটো তাঁর আদর্শ রাষ্ট্রের একজন আদর্শ নাগরিক হওয়ার জন্য কঠোর নিয়মানুবর্তিতা ও প্রশিক্ষণের উপর জোর দিয়েছেন। শিক্ষার প্রতিটি স্তর অতিক্রমের পর সর্বশেষ স্তরে লোভ ও দুর্নীতি থেকে তারা কতটা মুক্ত হতে পেরেছে তার পরীক্ষা নেওয়া হয়। এই স্তরটিতে উত্তীর্ণ হওয়া ব্যক্তিগণ শাসক হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করবেন বলে প্লেটো অভিমত প্রকাশ করেছেন।
সাম্যবাদী তত্ত্ব

ন্যায়নীতির ভিত্তিতে প্লেটো যে আদর্শ রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার মডেল উপস্থাপন করেছেন তাতে মূলত শাসক শ্রেণির জন্য একপ্রকার সাম্যবাদের আদর্শ সংযোজিত করা হয়েছে। বস্তুতপক্ষে প্লেটোর লক্ষ্য ছিল- শাসক শ্রেণির জীবনধারাকে এক সমভোগবাদী আদর্শে চালিত করা। এমনকি পারিবারিক জীবনেও তিনি সমভোগবাদের কথা বলেছেন।

প্লেটোর রাষ্ট্রদর্শন সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। তা সত্ত্বেও একথা বলা যায় যে রাষ্ট্র সম্পর্কে তাঁর ভাবনার গভীরতা এবং ব্যাপকতা নিঃসন্দেহে ভাবীকালের জন্য শিক্ষণীয়। শাসকের নৈতিক আচরণ, রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে ব্যক্তির ক্ষুদ্র স্বার্থের বিসর্জন ইত্যাদি আধুনিক কল্যাণকামী রাষ্ট্রব্যবস্থা রূপায়ণের কাজে পথপ্রদর্শকের কাজ করবে।

২। অ্যারিস্টটলের রাষ্ট্রচিন্তার সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও

বিশ্ব ইতিহাসে প্রথম বাস্তবধর্মী রাষ্ট্রদর্শনের রূপকার ছিলেন গ্রিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অ্যারিস্টটল (৩৮৪-৩২২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)। ভারতীয় রাষ্ট্রবিদ কৌটিল্যের সমসাময়িক দার্শনিক অ্যারিস্টটল সর্বপ্রথম রাষ্ট্রনীতিচর্চাকে সমাজ বিজ্ঞানের একটি স্বতন্ত্র শাখা (রাষ্ট্রবিজ্ঞান) হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

অ্যারিস্টটলের রাষ্ট্রচিন্তা

গ্রিক সমাজ, দর্শন ও রাজনীতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং তর্কশাস্ত্র, বিজ্ঞান, দর্শন ইত্যাদি বিভিন্ন শাস্ত্রে . পাণ্ডিত্য ছিল অ্যারিস্টটলের রাষ্ট্রচিন্তার মৌল উপাদান। দ্য পলিটিকস (The Politics) নামক গ্রন্থে তিনি আদর্শ রাষ্ট্র গঠনের জন্য তাঁর চিন্তাভাবনা প্রকাশ করেছেন।

রাষ্ট্রের উৎপত্তি

অ্যারিস্টটলের মতানুসারে, রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়েছে প্রাকৃতিক বা স্বাভাবিক নিয়মে। প্রথমে মানুষ পরিবার গঠন করেছে। তারপর কতকগুলি পরিবার একত্রিত হয়ে গড়ে তুলেছে গ্রাম। কালক্রমে মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজন বৃদ্ধি পেতে থাকলে গ্রামগুলির সীমানা প্রসারিত হয়ে অনেকগুলি গ্রামের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে রাষ্ট্র (নগররাষ্ট্র)। তিনি এরূপ মত পোষণ করেছিলেন যে- একটি বীজ থেকে যেমন গাছের সৃষ্টি হয়, তেমনি পরিবার থেকে মানুষের নানাবিধ প্রয়োজন মেটানোর উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। পরিবার হল শুরু এবং রাষ্ট্র হল পরিণতি।

অ্যারিস্টটলের ধারণায় রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য

অ্যারিস্টটলের ধারণা অনুযায়ী রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্যগুলি হল-

  1. রাষ্ট্র গঠনের মূল কথা হল মানুষের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি।
  2. যুক্তি দ্বারা অ্যারিস্টটল দেখিয়েছেন যে, রাষ্ট্রের উৎপত্তি ঘটেছে স্বাভাবিকভাবেই, অর্থাৎ রাষ্ট্র একটি স্বাভাবিক প্রতিষ্ঠান।
  3. অ্যারিস্টটলের মতে, রাষ্ট্রের স্থান ব্যক্তি বা পরিবারের আগে।
  4. অন্যান্য সংগঠন বা সংস্থা অপেক্ষা রাষ্ট্রকে সর্বোচ্চ সংগঠন হিসেবে তুলে ধরতে উদ্যত হয়েছিলেন অ্যারিস্টটল।
  5. রাষ্ট্রকে জীবদেহের সঙ্গে তুলনার মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন যে, রাষ্ট্র হল জীবদেহের ন্যায় এক পূর্ণাঙ্গ সত্তা।
সরকারের শ্রেণিবিভাগ

অ্যারিস্টটল The Politics নামক গ্রন্থে বিভিন্ন ধরনের সংবিধান, সরকার ও তার শ্রেণিবিভাগ সম্পর্কে সুসংবদ্ধ আলোচনা করেছেন। তিনি মূলত শাসকের সংখ্যা ও তার গুণ-এই দুটি বিষয়কে সামনে রেখে সরকারের স্তরবিভাজন করেছেন। তাঁর মতে, স্বাভাবিক (Pure) ও বিশুদ্ধ শাসনপদ্ধতি হল- রাজতন্ত্র (Monarchy), অভিজাততন্ত্র (Aristocracy) এবং বহুজনতন্ত্র (Polity)। অন্যদিকে বিকৃত (Perverted) শাসনপদ্ধতি হল- স্বৈরতন্ত্র (Tyranny), গোষ্ঠীতন্ত্র (Oligarchy) এবং গণতন্ত্র (Democracy)। F অ্যারিস্টটল পলিটি-কে সর্বোৎকৃষ্ট শাসনব্যবস্থা এবং গণতন্ত্রকে সবচেয়ে নিকৃষ্ট শাসনব্যবস্থা আখ্যা দিয়েছেন।

বিপ্লব সম্পর্কে অ্যারিস্টটলের অভিমত

অ্যারিস্টটল বিপ্লব অর্থে মূলত সরকার তথা সংবিধানের পরিবর্তনকে বুঝিয়েছেন। তিনি বিপ্লবের উৎস আলোচনা করে তার প্রতিকারও বিস্তৃতভাবে আলোচনা করেছেন।

  • (a) উৎস ও কারণ: সাম্যের আবেগই হল বিদ্রোহ বা কোনও বৈপ্লবিক  আন্দোলনের উৎস- এই ছিল অ্যারিস্টটলের অভিমত। কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যখন মনে করে যে রাষ্ট্র তথা কর্তৃপক্ষ তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করছে বা তারা নিপীড়িত হচ্ছে তখন তাদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার ঘটে, যা জন্ম দেয় বিদ্রোহ বা বিপ্লবের। তিনি আরও বলেছেন যে- ঔদ্ধত্য, ভয়, রাষ্ট্রের অসমান বিকাশ, ঘৃণা, নির্বাচনি ষড়যন্ত্র ইত্যাদি নানান কারণেও বিপ্লব ঘটতে পারে। স্বৈরতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র ও রাজতন্ত্রে ভিন্ন ভিন্ন কারণে বিপ্লব ঘটতে পারে বলে তিনি মত প্রকাশ করেছেন।
  • (b) প্রতিকার: অ্যারিস্টটল বিপ্লবের কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি এর প্রতিকার সম্পর্কেও মতামত প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, বিপ্লবের প্রতিকারগুলি হল- সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা আইনভঙ্গ-সহ যে-কোনো নিকৃষ্ট কার্যকলাপের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, • শাসক ও শাসিতের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, সম্ভ্রান্ত শ্রেণির মধ্যে সুসম্পর্ক ও ঐক্য বজায় রাখা ইত্যাদি।
অ্যারিস্টটলের আদর্শ রাষ্ট্র

অ্যারিস্টটল মনে করতেন যে, মানুষের এক সুন্দর মঙ্গলময় জীবন ও সুখ নির্ভর করে আদর্শ রাষ্ট্রব্যবস্থার উপর। বস্তুত তাঁর আদর্শ রাষ্ট্রের ধারণাটি সদগুণের উপর প্রতিষ্ঠিত। এইরূপ রাষ্ট্রের রূপরেখা অঙ্কন করতে গিয়ে তিনি চরম রাজতন্ত্র ও বিশুদ্ধ অভিজাততন্ত্রের কথাও তুলে ধরেছেন। যদিও পলিটি বা মিশ্র শাসনব্যবস্থাকে তিনি এক্ষেত্রে উপযোগী বলে বিবেচনা করেছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, অ্যারিস্টটল বর্ণিত আদর্শ রাষ্ট্রব্যবস্থা কয়েকটি শর্তের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে, যথা- সীমিত জনসংখ্যা, সাহসী ও বুদ্ধিমান জনগণ, মাঝারি আকারের রাষ্ট্র, নাগরিকতা, আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থা ও সুদৃঢ় প্রশাসনিক কাঠামো। তবে বলা প্রয়োজন, মধ্যবিত্ত শ্রেণি পরিচালিত সরকার, ক্রীতদাস প্রথা সমর্থনকে সর্বোপরি একটি কাল্পনিক ধারণারূপে সমালোচনা করা হয়েছে তাঁর আদর্শ রাষ্ট্রের তত্ত্বকে।

মূল্যায়ন

অ্যারিস্টটলের রাষ্ট্রদর্শন নানাভাবে সমালোচিত হয়েছে। অনেকের মতে, তাঁর রাষ্ট্রচিন্তা সংকীর্ণতা দোষে দুষ্ট। তিনি মূলত নগররাষ্ট্রের পরিসরেই তাঁর রাষ্ট্রচিন্তাকে অবাধ রেখেছিলেন। এসকল সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে অ্যারিস্টটলের অবদান অনস্বীকার্য। তিনি রাষ্ট্রের উৎপত্তি ও প্রকৃতি, সরকারের বিভিন্ন রূপ, ন্যায়বিচার, পরিবার এবং সম্পত্তি-সহ যে ব্যাখ্যাগুলি দিয়েছেন, তা রাষ্ট্রচিন্তার পরবর্তী ধারাকে যথেষ্ট পুষ্ট করেছিল। তাঁর এই রাষ্ট্রদর্শন খ্রিষ্টপূর্বাব্দ কালের হলেও বর্তমান সময়েও তা সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

৩। সিসেরোর রাষ্ট্রদর্শন সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করো।

অথবা, রাষ্ট্রদর্শন ও রাষ্ট্রীয় আইনবিধি সংক্রান্ত সিসেরোর অভিমত আলোচনা করো।

রোমের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক, রাজনীতিবিদ, আইনজ্ঞ, বাগ্মী এবং রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ছিলেন মার্কাস টুল্লিয়াস সিসেরো (Marcus Tullius Cicero)। – সুপণ্ডিত সিসেরোর বিভিন্ন বিষয়ে অভিজ্ঞতা থাকলেও আইন ও রাষ্ট্রনীতিচর্চায় বিশেষ কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন। De Republica (ইংরেজিতে On the Republic) এবং De Legibus (ইংরেজিতে On the Laws) গ্রন্থ দুটি থেকে তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার সম্যক পরিচয় মেলে।

সিসেরোর রাষ্ট্রদর্শন

প্লেটো, অ্যারিস্টটল, পলিবিয়াস ও স্টোয়িকদের মতবাদ দ্বারা সিসেরোর রাষ্ট্রদর্শন বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। প্লেটোর ন্যায় সিসেরোও তাঁর গ্রন্থ De Republica-তে এক আদর্শ রাষ্ট্রব্যবস্থার অনুসন্ধানে ব্রতী হয়েছিলেন।

রাষ্ট্রের উৎপত্তি

সিসেরো বিশ্লেষণ দ্বারা দেখিয়েছেন যে, রাষ্ট্র একদিনে গড়ে ওঠেনি, বিবর্তনের মাধ্যমে মানুষের প্রয়োজনে রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। সিসেরোর রাষ্ট্রব্যবস্থার দুটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হল ন্যায়বিচার ও যথার্থ আইনের প্রতি আনুগত্য।

শাসনব্যবস্থার স্বরূপ

সিসেরোর মতে রাজতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র কিংবা গণতন্ত্র যে-কোনো একটি শাসনব্যবস্থা রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব পেতে পারে। অবশ্য এই সকল শাসনপদ্ধতির কোনোটিই এককভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ বা ত্রুটিমুক্ত নয়।

  • (a) রাজতন্ত্র: এই শাসনব্যবস্থায় রাজার একক শাসন কায়েম থাকে। তিনি স্বেচ্ছাচারী হলে সাধারণের সমাজজীবন দুঃসহ হয়ে ওঠে। আবার রাজা সদাচারী, প্রজাহিতৈষী হলেও, রাজনীতিতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের কোনও সুযোগ থাকে না।
  • (b) অভিজাততন্ত্র: অভিজাততন্ত্র হল মুষ্টিমেয় এবং সমাজের ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তির শাসন। এক্ষেত্রেও শাসকদের মধ্যে গোষ্ঠীস্বার্থ, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ইত্যাদি প্রবল হলে শাসনব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও গতিশীলতা ব্যাহত হয়।
  • (c) গণতন্ত্র: উন্নত ও গ্রহণযোগ্য শাসনব্যবস্থা হল গণতন্ত্র। এখানে সর্বসাধারণের ইচ্ছা শাসনতন্ত্রে প্রকাশিত হয়। কিন্তু এই ব্যবস্থাও ত্রুটিমুক্ত নয়। সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের অক্ষমতা গণতন্ত্রকে দুর্বল করে। তখন গণতন্ত্র একদল উচ্ছৃঙ্খল মানুষের অপশাসনে পরিণত হয়।
মিশ্র সরকার

সিসেরোর মতে, সব সরকারের ভালো দিক ও খারাপ দিক দুই-ই আছে। সর্বশ্রেষ্ঠ শাসনব্যবস্থা হল- রাজতন্ত্র, অভিজাতন্ত্র ও গণতন্ত্রের ভালো দিকগুলি নিয়ে গঠিত এক মিশ্র শাসনব্যবস্থা। আবার এই শাসনব্যবস্থা যাতে কোনও একদিকে ঝুঁকে না পড়ে সেই জন্য তিনি নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য বজায় রাখার কথা বলেছেন।

আইন সংক্রান্ত ধারণা

De Legibus (On the Laws) গ্রন্থে সিসেরো দুই ধরনের আইনের উল্লেখ করেন, যথা- প্রাকৃতিক আইন (Law of Nature) এবং রাষ্ট্রীয় আইন বা স্বাভাবিক আইন (Law of State)।

  • (a) প্রাকৃতিক আইন: সিসেরোর মতে, বস্তুত যে নিয়ম বা আইনের

সাহায্যে ঈশ্বর বিশ্বব্রহ্মাণ্ড পরিচালনা করেন, তাকে বলা হয় প্রাকৃতিক আইন। রাষ্ট্র-সহ সমস্ত মানুষ এই প্রাকৃতিক আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এই আইন অপরিবর্তনীয়, অভ্রান্ত ও শাশ্বত।

সিসেরো আরও দেখিয়েছেন যে, প্রাকৃতিক আইন হল রাষ্ট্রের উৎস। তাই রাষ্ট্র প্রণীত বিভিন্ন আইনকে প্রাকৃতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। এর উপরেই রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আনুগত্য নির্ভর করে। প্রাকৃতিক আইনবিরোধী কোনোরকম রাষ্ট্রীয় আইনকে আইন বলা যায় না।

  • (b) রাষ্ট্রীয় বা স্বাভাবিক আইন: সিসেরোর মতে, রাষ্ট্রীয় আইন হল মানুষের সৃষ্ট। ব্যক্তি ও সমাজের কল্যাণের উদ্দেশ্যেই এই আইনগুলি রচিত হয়। সিসেরোর তত্ত্ব অনুযায়ী, রাষ্ট্রের শাসক দুধরনের আইনের সাহায্য নিয়েই দেশ শাসন করবেন। আইনের প্রতি মানুষের অকৃত্রিম আনুগত্য থাকা প্রয়োজন।
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা

সিসেরো তাঁর ডি রিপাবলিকা গ্রন্থে ন্যায়বিচার প্রসঙ্গে আলোচনায় বলেছেন যে- ন্যায়বিচার ও ন্যায়পরায়ণতা হল জাতির মেরুদণ্ড। ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠা না হলে সমাজে নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। কেবলমাত্র প্রাকৃতিক আইনের যথাযথ পালনই নয়, এর সঙ্গে সঙ্গে মনুষ্যসৃষ্ট আইনকেও মানবকল্যাণে সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারলে তবেই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে।

প্রাকৃতিক সাম্যের নীতি

সিসেরো প্রাকৃতিক সাম্যনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর মতে, প্রকৃতি সকল মানুষকেই সমান অধিকার প্রদান করে। সিসেরো সাম্যনীতিকে মানবজীবন ও রাষ্ট্রীয় জীবনের অপরিহার্য শর্ত বলে মনে করেন।

বিশ্বনাগরিকত্ব

সিসেরোর মতানুসারে, সকল মানুষই সর্বজনীন প্রাকৃতিক আইনের অধীন। সমগ্র বিশ্বকে তিনি একটি রাষ্ট্র হিসেবে কল্পনা করেছেন। সিসেরো পৃথিবীর সমস্ত রাষ্ট্র নিয়ে এক রাষ্ট্র সমবায় বা কমনওয়েলথ গঠনের আদর্শ তুলে ধরেন। এই রাষ্ট্রের নাগরিকরা বিশ্বনাগরিক হিসেবে সমান সুযোগসুবিধা পাবে এবং প্রত্যেকেই প্রাকৃতিক আইন মেনে চলবে।

আদর্শ রাষ্ট্রের ধারণা

সিসেরো আদর্শ রাষ্ট্রব্যবস্থাকে কোনও একটি ক্ষুদ্র গণ্ডিতে আবদ্ধ না রেখে বিশ্বসমাজের বৃহত্তম পরিসরে প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যত হয়েছিলেন। তাঁর মতে, একটি আদর্শ রাষ্ট্রব্যবস্থা নাগরিকদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চাহিদা বিকাশের উপযোগী ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে উঠবে।

নাগরিকদের কর্তব্য

আদর্শ নাগরিকেরা হবে সত্যনিষ্ঠা, ন্যায়পরায়ণতা-সহ বিভিন্ন সদগুণের অধিকারী। তাঁরা অন্যের ক্ষতি ও পরের সম্পত্তি হরণ করবে না, কেউ বিপদে পড়লে সাহায্য করবে এবং জনসাধারণের মঙ্গলের জন্য কাজ করবে। তাছাড়া নাগরিকদের গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য হল তারা পিতৃভূমি রক্ষার জন্য যুদ্ধ করবে।

জনকল্যাণসাধন

রাষ্ট্র বিষয়ে সিসেরোর চিন্তা প্রধানত জনগণের মঙ্গলচিন্তাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। তাঁর মতে, মানুষের মঙ্গলের উদ্দেশ্যেই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় আইনও মানুষের কল্যাণসাধনের জন্যই রচিত হয়। তাই স্বৈরাচারী ব্যবস্থা জনকল্যাণকর রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে অনুপযুক্ত।

মূল্যায়ন

সিসেরোর রাষ্ট্রদর্শন নানাভাবে সমালোচিত হয়েছে। প্রসঙ্গত বলা যায়, সমকালীন রোমের বাস্তব রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট বিচার করলে সিসেরোর চিন্তায় মৌলিকত্বের ছাপ ছিল খুবই সামান্য। তাছাড়া অনেকে মনে করেন, সিসেরো যে নীতি ও পদ্ধতি রোমে প্রয়োগ করতে চেয়েছিলেন তার সবকিছু বাস্তবসম্মত ছিল না। উক্ত সমালোচনা সত্ত্বেও ন্যায় প্রতিষ্ঠা, আদর্শ রাষ্ট্রগঠন ও সাম্যনীতি সম্পর্কে সিসেরোর অবদানকে কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না।

৪। সেনেকার রাষ্ট্রচিন্তা বা রাষ্ট্রদর্শন সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করো।

রোমানদের নির্বিকারবাদী দর্শনের ক্ষেত্রে যেসকল দার্শনিক বিশেষ অবদান রেখেছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন সেনেকা দ্য ইয়ংগার (Lucius Annaeus Seneca the Younger)। তিনি ছিলেন সম্রাট নিরোর শিক্ষক এবং তার একজন মন্ত্রী। একাধারে দার্শনিক, রাষ্ট্রনায়ক ও নাট্যকার হিসেবে সেনেকার খ্যাতি ছিল সুবিদিত। তাঁর সমৃদ্ধ রাষ্ট্রচিন্তা বিশ্ব রাষ্ট্রবিজ্ঞানচর্চাকে বিশেষভাবে পরিপুষ্ট করেছিল।

সেনেকার রাষ্ট্রচিন্তা / রাষ্ট্রদর্শন

সেনেকার রাষ্ট্রদর্শনের কেন্দ্রে আছে মানুষের স্থান। মানুষের মধ্যে সৎ ও অসৎ-উভয় গুণের সমাবেশ ঘটা সম্ভব বলেই তিনি মনে করতেন। তবে প্রকৃত কল্যাণকামী রাষ্ট্রজীবন গড়ে তোলার জন্য তিনি মানুষের সদ্‌গুণাবলির বিকাশকেই একমাত্র পথ বলে মনে করেন।

রাষ্ট্রদর্শনের মৌলিক শর্তসমূহ

সেনেকার রাষ্ট্রদর্শনের মৌলিক শর্তগুলি হল-

  1. রাষ্ট্র শক্তি বা আইনের উপর নির্ভরশীল হবে না। রাষ্ট্র হবে একটি বৃহত্তর সমাজ। যে সমাজের চরিত্র হবে ধর্মীয় এবং নৈতিক।
  2. দুর্নীতিগ্রস্ত ও বিশৃঙ্খল জনগণ একটি রাষ্ট্রের পক্ষে বিপজ্জনক। সেনেকা যেসময় রাজনীতি নিয়ে চিন্তাভাবনায় রত ছিলেন সেসময় রোম-এর অবস্থা ছিল বেশ সংকটজনক-তবে এই সংকটের অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল মূলত দুর্নীতি ও অদূরদর্শিতার কারণে। জনগণ এতটাই দুর্নীতিগ্রস্ত ও বিশৃঙ্খল হয়ে পড়েছিল যে তিনি মনে করতেন দুর্নীতিগ্রস্ত জনগণ অপেক্ষা স্বৈরাচারী শাসনই শ্রেয়।
  3. গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার থেকে স্বৈরাচারী শাসন জনসমাজের শান্তি ও প্রগতির পক্ষে বেশি কার্যকরী। তবে নৈতিকতাসমৃদ্ধ জনসমাজের প্রতিষ্ঠা হলে, কোনও ব্যক্তি বা আইনের শাসন দরকার হবে না। এই নৈতিকতার মর্মকথা হল সর্বোচ্চ সদগুণাবলি অর্জন, বিলাসিতার জীবন পরিহার করা, সুখী ও নিষ্পাপ জীবনযাপন করা, গুণীজনকে শ্রদ্ধা করা ইত্যাদি।
  4. উচ্ছৃঙ্খল ও অসৎ মানুষের জন্যেই সরকারের প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ সরকার ও আইনকানুন হল বিপথগামী মানুষকে পরিচালিত বা নিয়ন্ত্রিত করার লক্ষ্যে ঈশ্বর মনোনীত একটি প্রতিষ্ঠান।
  5. মানবজীবনের শ্রেষ্ঠ ধর্ম হল মানবসেবা বা সমাজসেবা। রাষ্ট্রক্ষমতা বা সরকারের কর্তৃত্ব এই ধর্মের বিরোধী।
  6. রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ মানবসেবার জন্য শ্রেষ্ঠ বিকল্প নয়। প্রকৃত জ্ঞানী ও সৎ ব্যক্তিরাই মানবতার শ্রেষ্ঠ সেবক হওয়ার উপযুক্ত। উল্লেখ্য যে, খ্রিস্টান আনুগত্য ও ভাবনার প্রচারে সেনেকার তত্ত্ব পরবর্তীতে বিশেষভাবে সাহায্য করেছিল।
দুই কমনওয়েলথ তত্ত্ব

সেনেকার রাষ্ট্রচিন্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল- দুই কমনওয়েলথ তত্ত্ব। এই দুই কমনওয়েলথ হল- পৌর রাষ্ট্র (Civil State) ও বৃহত্তর রাষ্ট্র (Greater State) প্রত্যেক মানুষ দুটি কমনওয়েলেথের সদস্য। একদিকে যেমন সে পৌররাষ্ট্রের সদস্য আবার বিবেকবুদ্ধি ও মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষদের নিয়ে গঠিত বৃহত্তর রাষ্ট্রেরও সদস্য। সেনেকা বর্ণিত বৃহত্তর রাষ্ট্র আসলে রাষ্ট্র বলতে যা বোঝানো হয় তা ছিল না- ছিল সমাজ, যেখানে সদস্যগণ নীতিগত ও ধর্মীয় বন্ধনে আবদ্ধ থাকে। রাজনৈতিক গুণবর্জিত অথবা রাজনীতি সম্পর্কে নিস্পৃহ বেশকিছু বিদ্বান মানুষ এখানে সমাজসেবায় সচেষ্ট হবে। এই পথেই সেনেকার রাষ্ট্রদর্শন হয়ে উঠেছে চরম নীতিজ্ঞানমূলক।

শাসক সম্পর্কে অভিমত

সম্রাট নিরোর সময়কালে রোমান সমাজ ও রাজনীতি ব্যাপক দুর্নীতিতে ছেয়ে গিয়েছিল। স্বৈরাচার ও স্বেচ্ছাচার রোমান সাম্রাজ্যকে গ্রাস করেছিল। সেনেকার বক্তব্য ছিল এরূপ পরিস্থিতিতে কোনও সৎ, শিক্ষিত, জ্ঞানী ব্যক্তি রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভ করে ভালো কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারতেন না। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় তারা স্বৈরাচারীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন অথবা ব্যবস্থাটি ত্যাগ করে চলে যান। অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে কম জ্ঞানী, কম শিক্ষিত, কম সৎ কিন্তু রাষ্ট্রশাসনে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা আছে এরকম ব্যক্তি ক্ষমতায় এলে মানুষের যথেষ্ট মঙ্গলসাধন করতে পারেন। সেনেকার দৃষ্টিতে এরা হলেন ভালো নেতা এবং এদের পরিচালিত সরকার হল ভালো সরকার। বস্তুতপক্ষে সেনেকা ভিন্নতর উপায়ে নিজের নির্বিকারবাদী দর্শন প্রচার করেছেন অক্লান্তভাবে।

সমাজসেবা বিষয়ে মন্তব্য

সেনেকা বলেছেন যে, বেশিরভাগ বিজ্ঞ ও শিক্ষিত ব্যক্তি সুশাসক হতে পারেন না। ভোগবাদকে দূরে সরিয়ে রেখে তিনি বিজ্ঞ ব্যক্তিদের অপরের জন্য কল্যাণমূলক কাজ তথা সমাজসেবার নির্দেশ প্রদান করেছেন।

জনগণের অধিকার ও দাসদের সম্পর্কে মন্তব্য

জনগণের অধিকার ও দাসদের প্রতি আচার-ব্যবহার বিষয়েও সেনেকার রাষ্ট্রদর্শনে আলোচনা রয়েছে। তাঁর রচনার মধ্য দিয়ে তিনি নির্বিকারবাদ নির্দেশিত ভ্রাতৃত্ববোধের মহিমাময় দিকটির কথা তুলে ধরেছেন। সামাজিক ভেদাভেদ তাঁর কাছে ছিল চরম নিন্দনীয় এক বিষয়। দাসদের সমগ্র মানবসত্তা কেনাবেচা যায় না বলে উল্লেখ করে তিনি দাসদের রক্ষার কথা প্রকাশ করেন। যদিও এই ব্যবস্থাকে তিনি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন বলা যায় না।

ধর্মীয় ভাবনা

সেনেকার রাষ্ট্রদর্শনে ধর্মীয়ভাব লক্ষণীয়। মানুষের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শনের কথা তিনি বলেছিলেন, বলাবাহুল্য রোমান সাম্রাজ্যে সদ্য বিস্তৃত খ্রিস্টান ধর্মের মধ্যে সেনেকার দর্শন গুরুত্ব পেয়েছিল। সেনেকা মানুষের রাজনৈতিক গুণাবলির চেয়ে ক্ষমা, দয়া, দান, সহিষ্ণুতা প্রভৃতিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রাক রাষ্ট্রীয় আদিম পর্বে সরকার বা আইনের প্রয়োজন ছিল না- ব্যক্তিগত সম্পত্তির আবির্ভাব ঘটার দরুন মানুষ লোভী ও স্বার্থপর হতে থাকলে সরকার বা রাষ্ট্রের প্রয়োজন দেখা দেয়। অর্থাৎ সরকারকে মন্দ প্রবৃত্তির প্রতিষেধক বলা যায়। ক্রমেই সেনেকার দর্শন খ্রিস্টান ধর্মের প্রাথমিক চিন্তাধারার ভিত্তি হয়ে উঠতে থাকে।

উপরোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে রাষ্ট্রদর্শনের ক্ষেত্রে সিসেরো এবং সেনেকার দর্শনের মধ্যে বহুক্ষেত্রে স্বাতন্ত্র্য ও বিরোধিতা লক্ষ করা যায়। তবে রোমান রাষ্ট্রচিন্তায় সেনেকার বক্তব্য বা মতবাদের গুরুত্ব যে বহুবিধ একথা বলাই যায়।

৫। টমাস ক্রমওয়েলের সংস্কারগুলি সম্পর্কে যা জানো লেখো।

ষোড়শ শতকে ইংল্যান্ডের ধর্মীয়, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, পররাষ্ট্র-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে টমাস ক্রমওয়েলের সংস্কারগুলি ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

টমাস ক্রমওয়েলের সংস্কারসমূহ

ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরির প্রধান পরামর্শদাতা ও সচিব হিসেবে, টমাস ক্রমওয়েল যেসকল সংস্কারসাধন করেছিলেন সেগুলি হল-

(i) পোপের প্রাধান্য খর্ব

ইংল্যান্ডের শাসক অষ্টম হেনরির সঙ্গে রানি ক্যাথরিনের বিবাহবিচ্ছেদ সংক্রান্ত প্রশ্নে পোপের সঙ্গে রাজার প্রবল বিরোধ দেখা দেয়। ইংল্যান্ডের উত্তরাধিকারী হিসেবে একটি পুত্রসন্তান লাভের আশায়, ক্যাথরিনের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে অষ্টম হেনরি অ্যান বোলিন (Anne Boleyn)-কে বিবাহ করতে চেয়েছিলেন, যেখানে পোপ অনুমতি দিতে বিলম্ব করেন। এই পরিস্থিতিতে অষ্টম হেনরিকে সমর্থন করে ক্রমওয়েল পোপের ক্ষমতা খর্ব করতে উদ্যত হন। তাঁর উদ্যোগে ১৫৩১ খ্রিস্টাব্দে, Christ doth-এর অনুমোদনের ভিত্তিতে রাজা অষ্টম হেনরিকে ইংল্যান্ডের চার্চের সকল ক্ষমতার অধিকারী ঘোষণা করা হয়। এইভাবে চার্চগুলিতে রাজার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করে পোপের প্রাধান্য খর্ব করা হয়।

(ii) চার্চের জাতীয়করণ

ইংল্যান্ডে জাতীয় প্রশাসন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে টমাস ক্রমওয়েল পাদুয়ার মার্সিলিও (Marsilio Ficino)-এর চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। মার্সিলিও যেমন পোপের ক্ষমতার বিরুদ্ধে সম্রাটের কর্তৃত্বের দাবি জানান, ঠিক সেরকমই ক্রমওয়েলও এই মত অনুযায়ী পোপের ক্ষমতাকে খর্ব করে রাজা বা সম্রাটকে সকল ক্ষমতার অধিকারী করে তোলেন। এই রাজতন্ত্রের ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টায় ক্রমওয়েলের উদ্যোগে ইংল্যান্ডে জাতীয় চার্চ গড়ে তোলা হয়। এর ফলে রোমান চার্চের সঙ্গে সবরকমের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায় এবং দেশে জাতীয় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।

(iii) রিফরমেশন পার্লামেন্ট

ইংল্যান্ড থেকে রোমান চার্চকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য ক্রমওয়েলের সক্রিয়তায় পার্লামেন্টকে কাজে লাগানো হয়েছিল যা ইতিহাসে রিফরমেশন পার্লামেন্ট নামে পরিচিত (১৫২৯-১৫৩৬ খ্রিস্টাব্দ)। রাজা অষ্টম হেনরি ৩ নভেম্বর, ১৫২৯ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ ক্রমওয়েলের পরামর্শে পার্লামেন্টের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করেন। এই পার্লামেন্টে অষ্টম হেনরির পক্ষে নানা আইন পাস করা হয়, যেমন- প্রোবেট অ্যান্ড মরচুয়ারি অ্যাক্ট, অ্যাক্ট অফ প্লুরালিটিজ, স্ট্যাটুট অফ প্রেমুনিয়ার, অ্যাক্ট ইন রেসট্রেন্ট অফ অ্যানেটস, অ্যাক্ট ইন রেসট্রেন্ট অফ অ্যাপিলস, অ্যাক্ট অফ সাকসেশন, অ্যাক্ট অফ ট্রিজন ইত্যাদি। এগুলির মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য ছিল ১৫৩৪ খ্রিস্টাব্দে পাস হওয়া অ্যাক্ট অফ সুপ্রিমেসি (Act of Supremacy) আইনটি। এই আইনে ইংল্যান্ডের সমস্ত চার্চের প্রধান হিসেবে রাজার সার্বভৌমত্বকে আইনগত স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

(iv) মঠব্যবস্থার উচ্ছেদ

পোপের অর্থসংগ্রহের অন্যতম কেন্দ্র ছিল মঠ। অষ্টম হেনরি বুঝতে পারেন যতদিন মঠের অস্তিত্ব থাকবে ততদিন পোপ তাঁর প্রভাব বজায় রাখতে পারবে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন যুদ্ধবিগ্রহের কারণে রাজার রাজকোশ শূন্য হয়ে গিয়েছিল। তাই অষ্টম হেনরি এসময় মঠগুলির সম্পত্তি লাভ করতে আগ্রহী হয়। এই কাজে তাঁকে সহায়তা করেন টমাস ক্রমওয়েল। মঠ বিলোপের ক্ষেত্রে তিনি যে দুটি আইন পাস করেন তা হল-

  • প্রথম উচ্ছেদ আইন: ১৫৩৬ খ্রিস্টাব্দে প্রথম উচ্ছেদ আইনটি প্রবর্তন করা হয়। যেসব মঠগুলির বাৎসরিক আয় ২০০ পাউন্ড-এর কম সেই মঠগুলিকে দুর্নীতির অভিযোগে ভেঙে দেন। এর ফলাফলস্বরূপ উত্তর ইংল্যান্ডে এক বিদ্রোহের সূচনা হয় যা পিলগ্রিমেজ অফ গ্রেস (Pilgrimage of Grace) নামে পরিচিত। টমাস ক্রমওয়েল এই বিদ্রোহকে কঠোর হাতে দমন করেন।
  • দ্বিতীয় উচ্ছেদ আইন: ১৫৩৯ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডে অবশিষ্ট বৃহৎ মঠগুলির উচ্ছেদ করা হয় এই আইনের মাধ্যমে এবং সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে রাজার হস্তগত করা হয়।
(v) গ্রেট বাইবেল-এর সংস্করণ

ইতিপূর্বে খ্রিস্ট ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ বাইবেল মূলত লাতিন ভাষায় ছাপা হত। এইসব লাতিন ও অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষায় মুদ্রিত বাইবেল ইংল্যান্ডে প্রচলিত ছিল। টমাস ক্রমওয়েল ইংরেজি ভাষায় বাইবেল অনুবাদের জন্য মাইলস কভারডেল (Myles Coverdale)-কে নির্দেশ দেন। শেষপর্যন্ত ১৫৩৯ খ্রিস্টাব্দে গ্রেট বাইবেল প্রকাশিত হয় ইংরেজি ভাষায়। এই বাইবেল প্রতিটি চার্চে রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়।

(vi) প্রশাসনিক ব্যবস্থার পরিবর্তন

ক্রমওয়েল যখন ক্ষমতায় আসে তখন প্রশাসনিক ব্যবস্থায় মধ্যযুগীয় কাঠামো প্রতিষ্ঠিত ছিল। টমাস ক্রমওয়েল তা পরিবর্তন করে জাতীয় আমলাতান্ত্রিক কাঠামো প্রবর্তন করেন। তিনি গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রশাসন ও সরকারকে ঢেলে সাজান। এর পাশাপাশি ক্রমওয়েল মোট ১৯ জন কাউন্সিলারকে নিয়ে প্রিভি কাউন্সিল গঠন করেন। এ ছাড়াও রাজা ব্যক্তিগত সেক্রেটারি পদ গঠন করেন। ক্রমওয়েল নিজেই এই পদ গ্রহণ করেন এবং নিজেকে প্রশাসনের প্রধানরূপে প্রতিষ্ঠা করেন। এভাবেই তিনি প্রশাসনিক ব্যবস্থায় আধুনিকতা নিয়ে আসেন।

(vii) অর্থনৈতিক পদক্ষেপ

আলোচ্য পর্বে ক্রমওয়েল আর্থিক ব্যবস্থার পুনর্গঠন করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেন। তিনি এক্সচেকার (Exchequer), ডাচি অফ ল্যাঙ্কাস্টার (Duchy of Lancaster) এর মতো নতুন নতুন অর্থবিভাগের স্থাপনা করেন। তাঁর সংস্কারের দরুন রাজার আয় প্রায় দুগুণ বৃদ্ধি পায়।

(viii) পররাষ্ট্রনীতি

ক্রমওয়েলের উদ্যোগে ইংল্যান্ড ফ্রান্সের সঙ্গে মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাছাড়া ইংল্যান্ডের সঙ্গে জার্মানির রাজন্যবর্গেরও মিত্রতার সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

(ix) অন্যান্য পদক্ষেপ

ক্রমওয়েল গৃহীত অন্যান্য উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপগুলি ছিল- জমি লেনদেনের নিবন্ধীকরণ, স্থানীয় গির্জায় জন্ম-মৃত্যু-বিবাহ ইত্যাদি বিষয়গুলির নিবন্ধীকরণ, পার্লামেন্টের সদস্যদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সদস্য মনোনয়নে মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে অগ্রাধিকার প্রদান প্রভৃতি।

উপরোক্ত পদক্ষেপগুলি গ্রহণের মাধ্যমে টমাস ক্রমওয়েল ইংল্যান্ডে শক্তিশালী ও নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কাজকে অনেকটাই এগিয়ে দিয়েছিলেন। তাই বলা যায়, ইংল্যান্ডে নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ক্রমওয়েলের অবদান ছিল অনস্বীকার্য।

ঐতিহাসিক জিওফ্রে এলটন-এর মতে, টমাস ক্রমওয়েলের নেতৃত্বে ১৫৩০-এর দশকে ইংল্যান্ডের সরকারি ব্যবস্থার মধ্যে একটি বিপ্লব সাধিত হয়, যা ইংল্যান্ডের ইতিহাসে টিউডর বিপ্লব (Tudor Revolution in Government) নামে পরিচিত। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ইংল্যান্ডের সরকারি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার পরিবর্তনকে এই অর্থে বৈপ্লবিক বলা যায় যে, এর দরুন ইংল্যান্ডের সংবিধান এবং সরকার বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। অবশ্য টিউডর বিপ্লব বলতে যা বোঝায়, তা কোনও পুরোনো ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে নতুনভাবে তৈরি হয়নি। এলটনের এই বিপ্লব সম্পর্কিত মতটি বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়।

৬। আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তাবিদ হিসেবে নিকোলো ম্যাকিয়াভেলির ভূমিকা বিশ্লেষণ করো

অথবা, ম্যাকিয়াভেলির রাষ্ট্রচিন্তা ব্যাখ্যা করো।

অথবা, আধুনিক রাষ্ট্র সম্পর্কে ম্যাকিয়াভেলির রাষ্ট্রচিন্তার প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয়গুলি সম্পর্কে আলোচনা করো।

আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তাবিদ হিসেবে নিকোলো ম্যাকিয়াভেলির ভূমিকা

নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি (Niccolo di Bernardo dei Machiavelli) ছিলেন ইটালির একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, রাজনৈতিক তাত্ত্বিক এবং কূটনীতিবিদ। নবজাগরণের পীঠস্থান ইটালির ফ্লোরেন্স শহরের এক অভিজাত পরিবারে ম্যাকিয়াভেলি জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে তিনি ফ্লোরেন্সের কূটনৈতিক ও সরকারি কাজ দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করেন এবং সেখানকার প্রজাতন্ত্রের শেষ প্রধান সোদেরিনির মুখ্য পরামর্শদাতা হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

রাষ্ট্রচিন্তার উৎস

সমকালীন ইটালির নগররাষ্ট্রগুলির মধ্যে অবিরত দ্বন্দ্ব, সামন্তব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা, অন্যদিকে নবজাগরণের উদ্যমশীলতা এবং গ্রিক ঐতিহাসিক প্লেটো, অ্যারিস্টটল, পলিবিয়াস কিংবা রোমান দার্শনিক সিসেরোর রাষ্ট্রচিন্তা ও ভাবাদর্শ ম্যাকিয়াভেলিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।

ম্যাকিয়াভেলি রচিত গ্রন্থ

সাহিত্যিক হিসেবে ম্যাকিয়াভেলি বিভিন্ন গ্রন্থ রচনা করলেও, তাঁর রাজনৈতিক ধারণা সম্পর্কে মূলত দুটি গ্রন্থ থেকে জানা যায়-

  • দ্য প্রিন্স (The Prince): এই গ্রন্থের বিষয় নবীন রাজতন্ত্র, যেখানে শাসকের শক্তি, স্বৈরাচার ও কঠোর নিয়ন্ত্রণের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
  • দ্য ডিসাকার্সেস (The Discourses): এই গ্রন্থে প্রজাতান্ত্রিক সরকারকে কেন্দ্র করে আলোচনা করা হয়েছে, যেখানে প্রজাতন্ত্রের ভিত্তি সুদৃঢ় করতে সরকারের সঙ্গে নাগরিকদের স্বতঃস্ফূর্ত আনুগত্য ও সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

আলোচনা পদ্ধতি

ম্যাকিয়াভেলি তাঁর আলোচনায় মূলত কঠোর বাস্তববোধকেই কাজে লাগিয়েছেন। সেইসঙ্গে রাষ্ট্রতত্ত্বে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তিনি তথ্য সংগ্রহ, পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষণের মতো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির আশ্রয় নিয়েছেন। পাশাপাশি ইতিহাসের সাহায্যগ্রহণ ছিল ম্যাকিয়াভেলির রাষ্ট্রদর্শন গড়ে তোলার এক উল্লেখযোগ্য পদ্ধতি। এ ছাড়া তাঁর রাষ্ট্রতত্ত্বে অ্যারিস্টটলের আরোহমূলক পদ্ধতিরও (বিশেষ থেকে সাধারণে পৌঁছোবার পরিকল্পনা) প্রতিফলন ঘটতে দেখা যায়।

ম্যাকিয়াভেলির রাষ্ট্রচিন্তার বৈশিষ্ট্য

ম্যাকিয়াভেলির রাষ্ট্রচিন্তার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলি হল-

  • স্বতন্ত্র রাষ্ট্রভাবনা: প্রচলিত রাজনৈতিক সীমানায় আবদ্ধ না থেকে তিনি এক স্বতন্ত্র রাষ্ট্রভাবনা উপস্থাপন করেছিলেন। তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রের ক্ষমতা, মর্যাদা ও স্থায়িত্ব রক্ষার পথ উদ্ভাবন করা।
  • আধুনিকতা: ম্যাকিয়াভেলি মধ্যযুগীয় ধ্যানধারণার বেড়াজাল ছিন্ন করে আধুনিক যুক্তিবাদী, বাস্তববাদী ও বৈজ্ঞানিক চিন্তাচেতনার উন্মেষ ঘটিয়েছিলেন।
  • ধর্মনিরপেক্ষতা: তিনি ধর্ম থেকে রাজনীতিকে মুক্ত করেন ও বলেন যে, রাজনীতিতে ধর্মের অনুপ্রবেশ ঘটলে রাজনীতির নিজস্বতা ব্যাহত হবে।
  • নৈতিকতা বা মূল্যবোধ: ম্যাকিয়াভেলির মতে, ব্যক্তির মূল্যবোধ ও রাষ্ট্রের মূল্যবোধ এক হতে পারে না। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষার প্রয়োজনে শাসক শঠতা, বিশ্বাসঘাতকতার আশ্রয় নিলে তা অনৈতিক নয়।
  • প্রয়োজনভিত্তিক রাষ্ট্রনীতি: রাজতন্ত্রের ভিত সুদৃঢ় করার স্বার্থে ম্যাকিয়াভেলি বাহুবল (Good Arms), ভালো আইন (Good Law), ভালো দৃষ্টান্ত (Good Examples)-এর প্রয়োজনভিত্তিক প্রয়োগ করার উপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

ম্যাকিয়াভেলির রাষ্ট্রচিন্তার প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয়সমূহ

(i) মানবপ্রকৃতি: ম্যাকিয়াভেলি তাঁর চিন্তাধারার কেন্দ্রবিন্দুতে মানুষকে স্থান দিয়েছেন। তিনি রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপের ভিত্তিতে মানবচরিত্রকে বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর মতে, মানুষ অকৃতজ্ঞ, প্রতারক, কাপুরুষ ন্যায়নীতিবোধহীন ও অর্থলিঙ্গু। এর ফলে মানুষের মধ্যে ক্ষমতা ও অর্থলাভের চাহিদা বাড়তে থাকে। এইজন্য মানুষে মানুষে সংঘাত সৃষ্টি হয় এবং রাষ্ট্রের মধ্যে বিশৃঙ্খলা লক্ষ করা যায়।

(ii) রাষ্ট্র ও তার বৈশিষ্ট্য: ম্যাকিয়াভেলির তত্ত্ব থেকে প্রাপ্ত রাষ্ট্রের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য হল- রাষ্ট্রকে চার্চ ও ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্কহীন সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ হতে হবে। মানুষ মূলত নিজ স্বার্থসিদ্ধি ও নিরাপত্তা রক্ষার প্রয়োজনেই রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে স্বাগত জানায়। রাষ্ট্র সবসময় নিজ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সচেষ্ট থাকে। সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত নাগরিকদের জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা প্রদানের মধ্য দিয়ে নিজ জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করা। ম্যাকিয়াভেলির মতে, জনগণ যে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাজে অংশ নিতে পারে, সেই রাষ্ট্র শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্র।

(iii) রাষ্ট্রের শ্রেণিবিভাগ: ম্যাকিয়াভেলি অ্যারিস্টটলের অনুকরণে রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সরকারকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন, যথা- রাজতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র ও নিয়মতান্ত্রিক গণতন্ত্র বা প্রজাতন্ত্র। তিনি মনে করতেন যে, একমাত্র সবল রাজতন্ত্রই রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করতে এবং জাতির গৌরব ও মর্যাদা বৃদ্ধি করতে পারে।

(iv) রাজতন্ত্রের স্বরূপ নির্ণয়: ম্যাকিয়াভেলি তাঁর The Prince গ্রন্থে রাজতন্ত্র সম্পর্কে আলোচনায় বলেছেন, রাজার প্রধান দায়িত্ব রাজ্যকে সুরক্ষিত করা। এ ছাড়াও রাজার কাজ হবে যে-কোনোভাবে রাজ্যশাসনের ভিত্তি সুদৃঢ় করা। তাঁর মতে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য রাজাকে যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী হতে হবে। রাজাকে তাঁর কাজকর্মে সাহস, দৃঢ়তা ও বীরত্ব দেখাতে হবে। পাশাপাশি যে-কোনো পরিস্থিতিতে রাজা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন এবং বিরোধীপক্ষকে বলপ্রয়োগের দ্বারা দমন করবেন। এককথায় রাষ্ট্রের গৌরব ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য রাজতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তার কথা ম্যাকিয়াভেলি উল্লেখ করেন।

(v) প্রজাতান্ত্রর স্বরূপ নির্ণয়: ম্যাকিয়াভেলি তাঁর The Discourses গ্রন্থে আলোচনার কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে প্রজাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার স্বরূপ ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি এই গ্রন্থে রাজতন্ত্র অপেক্ষা প্রজাতন্ত্র অর্থাৎ, মানুষের স্বার্থ ও ব্যক্তিস্বাধীনতাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে মুক্ত রাষ্ট্র (Free State) বলে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, সবধরনের শাসনব্যবস্থা থেকে প্রজাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাই শ্রেষ্ঠ। তিনি দুই ধরনের প্রজাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার কথা বলেছেন- ① অভিজাততান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র এবং জনগণের প্রজাতন্ত্র। তিনি সর্বসাধারণের জন্য জনগণের প্রজাতন্ত্রকে বেশি গুরুত্ব প্রদান করেন।

(vi) ক্ষমতাতত্ত্ব: ম্যাকিয়াভেলির মতে, রাজতন্ত্র ও প্রজাতন্ত্র উভয়ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব ও শৃঙ্খলা রক্ষার প্রাথমিক শর্ত হল ক্ষমতা দখল। জনগণকে শাসন করার মাধ্যম হল ক্ষমতা। ক্ষমতা দখলের পদ্ধতি, তা বজায় রাখা, বা কী ধরনের ভ্রান্তনীতির দরুন ক্ষমতার ভিত্তি দুর্বল হয় -এসব কিছুই ম্যাকিয়াভেলি তাঁর তত্ত্বে আলোচনা করেছেন। ল্যাস্কি (Laski)-র মতে, ম্যাকিয়াভেলির রাষ্ট্রতত্ত্ব হল Grammar of Power বা ক্ষমতার ব্যাকরণ। ক্ষমতা অর্জন ও তা ধরে রাখার পদ্ধতি নিয়ে এত গভীর বিশ্লেষণের জন্য সম্ভবত ম্যাকিয়াভেলিকে রাজনীতির ক্ষমতাতত্ত্বের প্রথম ও সার্থক প্রবক্তা বলা হয়।

মূল্যায়ন

ম্যাকিয়াভেলির রাষ্ট্রচিন্তা পরস্পরবিরোধী অভিমত হিসেবে যথেষ্ট সমালোচিত হয়েছে। এ ছাড়াও তাঁর রাষ্ট্রতত্ত্বের ত্রুটি হিসেবে মানুষের সদ্‌গুণাবলি উপেক্ষা, খণ্ডিত জাতীয়তাবোধ, বলপ্রয়োগকে গুরুত্ব দান, অসমাপ্ত তথ্য, যুগবিরোধী চিন্তা, ত্রুটিপূর্ণ ক্রমবিন্যাস প্রভৃতি বিষয়ের কথা বলা হয়ে থাকে। তবে ত্রুটিবিচ্যুতি থাকা সত্ত্বেও, ম্যাকিয়াভেলির রাষ্ট্রচিন্তা ব্যক্তির নৈতিকতা ও রাষ্ট্রের নৈতিকতার পার্থক্যকরণ, ক্ষমতা সংক্রান্ত তত্ত্ব, বুর্জোয়া শ্রেণির গুরুত্ব উপলব্ধি, অভিজ্ঞতার উপর গুরুত্ব আরোপ প্রভৃতি দিক থেকে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।

সর্বোপরি বলা যায়, ম্যাকিয়াভেলির চিন্তাধারায় রাষ্ট্রবিজ্ঞান আধুনিক রূপলাভ করেছিল। তাই আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পথিকৃৎ হিসেবে ম্যাকিয়াভেলির ভূমিকা অনস্বীকার্য।

৭। জাঁ বোদার রাষ্ট্রতত্ত্ব সম্পর্কে আলোচনা করো

অথবা, আধুনিক রাষ্ট্র সম্পর্কে জাঁ বোদার রাষ্ট্রচিন্তার মূল বক্তব্য সম্পর্কে আলোচনা করো।

জাঁ বোদার রাষ্ট্রতত্ত্ব

জাঁ বোদা (Jean Bodin) ছিলেন ষোড়শ শতকের ফ্রান্সের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, আইনজ্ঞ ও পণ্ডিত। Method for the Easy Comprehension of History, Six Books of the Commonwealth প্রভৃতি গ্রন্থে জাঁ বোদার রাষ্ট্রতত্ত্ব সম্পর্কিত আলোচনা স্থান পেয়েছে। তাঁর রাষ্ট্রতত্ত্ব সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হল-

(i) রাষ্ট্রের সংজ্ঞা: দার্শনিক জাঁ বোদা মনে করেন যে, ‘সংজ্ঞার মাধ্যমে যে সমস্যা বিবেচনা করা হচ্ছে তার সমাধান করা সম্ভব এবং সংজ্ঞা যদি সুনির্মিত না হয় তাহলে তার উপর ভিত্তি করে যা গড়ে তোলা হয় তা সত্বর ভেঙে পড়ে।’ তাই নিজের তত্ত্বে বোদা রাষ্ট্রের সংজ্ঞা দিতে উদ্যত হয়েছেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্র হল কয়েকটি পরিবার ও তাদের যৌথ সম্পত্তির সমন্বয়ে গঠিত একটি আইনসম্মত সরকার, যা সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী (The State is a lawful government, with sovereign power, of different households and their common affairs)।

(ii) পরিবারের ধারণা: পরিবারের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বোদা রোমান আইন দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছেন। তাঁর মতে, পরিবার হল পিতার নিয়ন্ত্রণাধীন কতিপয় ব্যক্তির সমষ্টি। পিতা-মাতা, পুত্র-কন্যা, গৃহভৃত্য ও তাদের যৌথ সম্পত্তির সমবায়ে তৈরি পরিবারকে বোদা স্বাভাবিক লোকসমাজ (Natural Community) বলে অভিহিত করেছেন। এই পরিবার থেকেই রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

(iii) রাষ্ট্রের উৎপত্তি: রাষ্ট্রের উদ্ভব প্রসঙ্গে বোদার অভিমত হল এই যে, মানুষের সামাজিক অনুভূতি বা আবেগের পরিণতি হল পরিবার এবং অন্যান্য ধর্মীয় বা অর্থনৈতিক সংগঠন। প্রাকৃতিক কারণেই একটি পরিবার থেকে একাধিক পরিবার গড়ে ওঠে। নিজেদের অস্তিত্ব ও স্বার্থরক্ষার তাগিদে পরিবারগুলি নিজেদের বসতি গড়ে তুলতে শুরু করে। এর জন্য স্থান দখল করাকে কেন্দ্র করে পরিবারগুলি একে অপরের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এই যুদ্ধে পরাজিতরা ক্রীতদাস হিসেবে বিজয়ী শ্রেণির প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করতে বাধ্য হয়। আর এভাবেই বলপ্রয়োগের মধ্য দিয়ে সমাজে বিকশিত হয় সার্বভৌম শক্তি এবং সার্বভৌম ক্ষমতাসম্পন্ন সর্বোচ্চ সংগঠন হিসেবে উদ্ভব ঘটে রাষ্ট্রের।

(iv) সার্বভৌমিকতা ও আইনের ধারণা: সিসেরোর Res Republica-র ধারণা গ্রহণ করে বোদা রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রধান ভিত্তি হিসেবে আইনের উপর গুরুত্ব দেন। বোদার মতে, একজন শাসকের হাতে আইনের দায়িত্ব থাকার পাশাপাশি যুদ্ধ করা, শান্তি স্থাপন, মুদ্রা ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ প্রভৃতি অধিকার ন্যস্ত করা উচিত। এটি সার্বভৌমিকতা নামে পরিচিত, যা হল রাষ্ট্রের চরম ও নিরন্তর ক্ষমতা। তবে রাষ্ট্রের সার্বভৌমিকতা কোনও আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়। একমাত্র প্রাকৃতিক আইন সার্বভৌম ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

অপরদিকে আইন সম্পর্কে বোদার ধারণা বস্তুতপক্ষে সার্বভৌমিকতা ধারণাটিরই প্রসারিত এবং পরিবর্ধিত রূপ। তাঁর মতে, সার্বভৌমই আইনের স্রষ্টা এবং আইন হল সার্বভৌমের ইচ্ছা বা আদেশ। সার্বভৌমের প্রধান কাজ হল আইন প্রণয়ন করা।

(v) সরকারের শ্রেণিবিভাগ: বোদা রাষ্ট্র ও সরকারকে মূলত তিন ভাগে ভাগ করে আলোচনা করেছেন, যথা- রাজতান্ত্রিক, অভিজাততান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক। সার্বভৌম ক্ষমতা ও অধিকার একজন ব্যক্তির হাতে থাকলে তা রাজতান্ত্রিক, এই ক্ষমতা কয়েকজনের হাতে থাকলে তা অভিজাততান্ত্রিক এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ সার্বভৌম ক্ষমতা ভোগ করলে তাকে গণতান্ত্রিক সরকার বলা যায়। বোদা উল্লেখ করেছেন যে, এই তিন সরকারের সমন্বয়ে গঠিত রাষ্ট্র বা মিশ্র রাষ্ট্র নৈরাজ্যের সৃষ্টি করতে পারে। তাই তা কখনোই কাম্য নয়। রাজতান্ত্রিক সরকার বা রাজতন্ত্রকেই তিনি সর্বোত্তম বলে বিবেচনা করেন।

(vi) রাষ্ট্রের কাজ: বোদার মতে, রাষ্ট্র সাধারণের স্বার্থ সংরক্ষণে সদাসর্বদা নিয়োজিত থাকবে। যেহেতু রাষ্ট্রের অস্তিত্ব সাধারণের সম্মতির উপর নির্ভরশীল, তাই জনসাধারণ তার ন্যূনতম পরিষেবা যদি রাষ্ট্র কর্তৃক না পেয়ে থাকে তবে রাষ্ট্র বিপন্নতার শিকারে পরিণত হবে। তাই রাষ্ট্রের প্রাথমিক কাজ হল মানুষের জীবনের নিরাপত্তা বিধান (Security), সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ এবং তার স্বাধিকার প্রতিষ্ঠায় যতটা সম্ভব সাহায্য করা।

(vii) নাগরিকতা: রাষ্ট্রের মূল আধার বা উপাদান হল নাগরিকতা। জাঁ বোদা অবশ্য রাষ্ট্রের সকল বাসিন্দাদের নাগরিক বলতে চাননি। ক্রীতদাস, নারী, শিশুদের তিনি জনগণের অংশ বলে মনে করলেও নাগরিক বলে মনে করেননি। তিনি নাগরিক বলতে স্বল্পসংখ্যক ব্যক্তিদের মনে করেন, যারা পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তারা পরিবারের কর্তৃত্বের সীমানা ছাড়িয়ে যখন অন্যান্য পরিবারের প্রধানদের সঙ্গে মিলিত হয়ে একত্রিতভাবে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌম কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের অধীনস্থ হয়, তখন পরিবারের এই গুরুত্বপূর্ণ সদস্যরাই নাগরিক হিসেবে পরিচিত হন।

(viii) বিপ্লব তত্ত্ব: বোদার রাষ্ট্রচিন্তার একটি মৌলিক চিন্তাধারা হল রাষ্ট্রের পরিবর্তন বা বিপ্লব সংক্রান্ত চিন্তাধারা। বোদার মতে, জীবদেহের মতো রাষ্ট্রের জন্ম, বৃদ্ধি ও ধ্বংস হয়। আর এই পথ ধরেই রাষ্ট্রের উন্নতি ও প্রগতির ধারা অব্যাহত থাকে। রাষ্ট্রের মৃত্যু অর্থাৎ অবক্ষয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রের পরিবর্তন ঘটে এবং এক কর্তৃপক্ষের হাত থেকে অন্য কর্তৃপক্ষের হাতে স্থানান্তরিত হয় সার্বভৌম ক্ষমতা। সুতরাং, রাষ্ট্রের পরিবর্তন বা রাষ্ট্রবিপ্লব একটি স্বাভাবিক ঘটনা। বোদা মনে করেন, রাষ্ট্রবিপ্লব দুধরনের হতে পারে- Alteratio অর্থাৎ রাষ্ট্রবিপ্লবের ফলে আইন ও অন্য প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তন ঘটলেও সার্বভৌমিকতা অপরিবর্তিত থাকে এবং Conversio অর্থাৎ এক্ষেত্রে বিপ্লবের কঠোর প্রয়োগের ফলে সার্বভৌমিকতার পরিবর্তন ঘটে। বোদার মতানুসারে, তিনটি কারণে বিপ্লব হতে পারে- ঐশ্বরিক, প্রাকৃতিক ও মানবিক। এর মধ্যে ঐশ্বরিক কারণগুলি হল অদৃশ্য ও অজ্ঞাত। অন্যদিকে প্রাকৃতিক কারণগুলি চন্দ্র, সূর্য, গ্রহনক্ষত্রের প্রভাবাধীন, যা জ্যোতিষবিদ্যার সহায়তায় মানুষ উপলব্ধি করতে সক্ষম। আর বিপ্লবের মানবিক কারণগুলি বিশ্লেষণ করে বোদা শাসককে অসাম্য প্রশমিত করা, নাগরিকদের অনিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতা ও মতামত প্রকাশের সুযোগ না দেওয়া প্রভৃতি পরামর্শ দিয়েছেন।

মূল্যায়ন: পরিশেষে বলা যায় যে, বোদার রাষ্ট্রতত্ত্ব সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত নয়। মধ্যযুগীয় মানসিকতা, স্ববিরোধী বক্তব্য, সার্বভৌমিকতা সম্পর্কে অস্পষ্টতা, ব্যক্তির ভূমিকাকে স্বীকার না করা প্রভৃতির দরুন বোদার তত্ত্ব সমালোচিত হয়েছে যথেষ্ট। তবে ত্রুটি থাকলেও সার্বভৌমত্বের আদর্শ, ধর্মনিরপেক্ষতা, আধুনিক ভাবধারা ইত্যাদির জন্য বোদার রাষ্ট্রতত্ত্বের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই ডানিং (Dunning), গেটেল (Gettell) প্রমুখ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে বোদার অবদানকে অমূল্য সম্পদ বলে মনে করেন।

৮। টমাস হবসের রাষ্ট্রদর্শন সম্পর্কে আলোচনা করো

অথবা, আধুনিক রাষ্ট্র সম্পর্কে টমাস হবসের রাষ্ট্রচিন্তার মূল বক্তব্য সম্পর্কে আলোচনা করো।

অথবা, হবসের রাষ্ট্রচিন্তার ধারাগুলির মূল্যায়ন করো।

টমাস হবসের রাষ্ট্রদর্শন

সামাজিক চুক্তি মতবাদের অন্যতম প্রবক্তা টমাস হবস (Thomas Hobbes) ছিলেন একজন বিশিষ্ট ইংরেজ রাষ্ট্রচিন্তাবিদ। Leviathan গ্রন্থের মধ্য দিয়ে হবস সামাজিক চুক্তি মতবাদের প্রেক্ষাপটে রাজতন্ত্র বজায় রাখার কথা বলেছেন। হবসের রাষ্ট্রদর্শনের মূল বিষয়গুলি হল-

(i) প্রকৃতির রাজ্য ও মানবপ্রকৃতি: হবস বলেছেন, রাষ্ট্রগঠনের আগে মানুষ প্রাক্-সামাজিক এক প্রকৃতির রাজ্যে (State of Nature) বসবাস করত। এখানে সামাজিক জীবনের প্রতি মানুষের ঝোঁক ছিল না। এরূপ প্রাক্-সামাজিক অবস্থায় চরিত্রগতভাবে Leviathan গ্রন্থের প্রচ্ছদ মানুষ ছিল স্বাধীন, হিংস্র, আত্মকেন্দ্রিক, ক্ষমতালিঙ্গু ও স্বেচ্ছাচারী। কোনও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বা কোনও নিয়ন্ত্রণ সেই সময় ছিল না। তারা একে অপরকে নিজেদের শত্রু বলে মনে করত। অভিন্ন বাসনা পরিতৃপ্তির জন্য নির্দয় প্রতিযোগিতা, একে অপরকে ক্ষমতায় ছাপিয়ে যাওয়ার ভয় এবং সর্বোপরি ক্ষমতা বৃদ্ধির অদম্য আকাঙ্ক্ষার দরুন মানুষে মানুষে তীব্র বিরোধ ও হানাহানি শুরু হয়। এই অবস্থাকেই হবস ‘প্রত্যেকের সঙ্গে প্রত্যেকের লড়াই’ (War of every man against every man) বলে উল্লেখ করেছেন। এই নৈরাজ্যজনক পরিস্থিতিতে মানুষের জীবনের কোনও নিরাপত্তা ছিল না। মানুষের জীবন ছিল নিঃসঙ্গ, দরিদ্র, ঘৃণ্য, পাশবিক ও স্বল্পায়ু।

(ii) রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা: প্রকৃতির রাজ্যের নৈরাজ্য থেকে মানুষ তার স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধি ও আত্মরক্ষার প্রাকৃতিক নিয়মেই বেরিয়ে আসার চেষ্টা করে। প্রকৃতির রাজ্যের মানুষ নিজেদের নিরাপত্তা ও স্থায়ী শান্তির জন্য এক সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে নিজেদের সমস্ত ক্ষমতা ও স্বাধীনতা এক সর্বশক্তিমান ব্যক্তি বা ব্যক্তিসংসদের হাতে অর্পণ করে দেয়। বিনিময়ে সেই ব্যক্তি বা ব্যক্তিসংসদ মানুষের নিরাপত্তা, শান্তি ও জীবনের সুরক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এইভাবে প্রকৃতির রাজ্যের অবসান ঘটে ও সৃষ্টি হয় চূড়ান্ত ক্ষমতাসম্পন্ন সার্বভৌম রাষ্ট্রের।

(iii) সামাজিক চুক্তি মতবাদ: হবসের তত্ত্বে রাষ্ট্রগঠনের পন্থা হিসেবে উঠে এসেছে সামাজিক চুক্তির প্রসঙ্গটি। বস্তুতপক্ষে, মানুষ প্রকৃতির রাজ্যের বিশৃঙ্খল ও অরাজক অবস্থা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য পরস্পরের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির দরুন সৃষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিসংসদ, তথা সার্বভৌম শক্তির হাতে মানুষ সর্বোচ্চ ক্ষমতা এবং অকুণ্ঠ আনুগত্য সমর্পণ করে। হবসের মতে, এই সামাজিক চুক্তি Jus Naturale অর্থাৎ, স্বাধীনতার রাজ্য (নিজের খুশি ও ক্ষমতা অনুযায়ী চলার পরিবেশ) থেকে মানুষকে পৌঁছে দেয় Lex Naturalis অর্থাৎ, আইনের রাজ্যে বা যুক্তি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত নিয়মের রাজ্যে।

(iv) রাষ্ট্রের প্রকৃতি: মানুষের মধ্যে চুক্তির দরুন, বহু মানুষের একক সত্তায় মিলিত হওয়ার মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে রাষ্ট্র বা কমনওয়েলথ, যাকে হবস বলেছেন Leviathan বা রাষ্ট্রদানব। এই রাষ্ট্র প্রকৃতিসৃষ্ট স্বাভাবিক দেহ নয়, মানব কর্তৃক সৃষ্ট একটি কৃত্রিম মানুষ, তথা একক ব্যক্তিত্ব। হবস বলেন যে, এই রাষ্ট্রদানব তথা অতিকায় সর্বশক্তিমান দানব হল ভিন্ন ভিন্ন মানুষের এক যান্ত্রিক সংযুক্তি। ক্ষমতা হল এই কৃত্রিম দেহের প্রাণ, রাজা হলেন এই প্রাণশক্তির প্রতীক রাষ্ট্রদেহের মস্তিষ্ক, দেহের জীবন ও গতির পরিচালক। তাঁর মতে, রাষ্ট্র মানুষের অর্জিত প্রতিষ্ঠান, কারণ- ভীতি ও আতঙ্কের পরিবেশ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য মানুষকে এই প্রতিষ্ঠান অর্জন করতে হয়। সেইসঙ্গে এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত, কারণ- নিজেদের ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে, আনুগত্য অর্পণ করে মানুষ নিঃশর্ত ক্ষমতা প্রদান করে একে টিকিয়ে রাখে। হবস কথিত রাষ্ট্রের ক্ষমতা ব্যাপক ও কর্তৃত্ব অবাধ, যা সকলপ্রকার আইনকানুনের ঊর্ধ্বে এবং এর কোনোরকম বণ্টন করা সম্ভব নয়। এই রাষ্ট্রকে যিনি পরিচালনা করেন, তিনিই হলেন সার্বভৌম শক্তি।

(v) সার্বভৌমিকতা: সার্বভৌমিকতা সম্পর্কে হবসের তত্ত্ব রাষ্ট্রচিন্তার জগতে তাঁকে বিশিষ্টতা দান করেছে। সার্বভৌমিকতা সম্পর্কে তিনিই প্রথম পরিপূর্ণ তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। হবসের মতে, চুক্তির দরুন ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা ব্যক্তিসংসদই হল সার্বভৌম শক্তি। সার্বভৌম ক্ষমতা একইসঙ্গে আইনের স্রষ্টা ও নৈতিকতার প্রবর্তক। তিনি বলেছেন, সার্বভৌম শাসকের দায়িত্ব হল সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা ও ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে সুরক্ষিত রাখা।

(vi) নাগরিক অধিকার ও চরম আনুগত্য: হবস অবাধ নাগরিক অধিকার ও স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেননি। তিনি মনে করতেন সার্বভৌম শক্তির প্রতি আনুগত্য প্রকাশ বা নিজেকে রাষ্ট্রের কাছে সমর্পণ করার মধ্যেই মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা নিহিত রয়েছে। তাঁর মতে, আদিম মানুষ শান্তি ও নিরাপদ জীবনের জন্য নিজেদের মধ্যে চুক্তি করে তাদের সমস্ত ক্ষমতা ও অধিকার সার্বভৌমের হাতে অর্পণ করেছে। সার্বভৌম হল চরম, অসীম ও অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার অধিকারী। তাই সার্বভৌমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার, তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার বা নতুন সার্বভৌম কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করার কোনও অধিকারও জনগণের হাতে থাকে না। সার্বভৌম-কর্তৃপক্ষ সৃষ্ট আইন লঙ্ঘন করলে কর্তৃপক্ষ সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারে।

(vii) রাষ্ট্রব্যবস্থা: হবস তাঁর রাষ্ট্রচিন্তায় তিন ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা বলেছেন- রাজতন্ত্র- যেখানে একজন ব্যক্তি বা ব্যক্তিসংসদের শাসন প্রতিষ্ঠিত এবং অভিজাততন্ত্র- যেখানে ব্যক্তিসাধারণের পরিষদ শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত এবং গণতন্ত্র- যেখানে জনগণ সাধারণ সভার মাধ্যমে শাসনকার্য পরিচালনা করে থাকে। তবে হবস রাজতন্ত্রকেই শ্রেষ্ঠ শাসনব্যবস্থা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, রাজতন্ত্রের প্রধান গুণ হল- এটি স্থিতিশীল ও সংকটকালীন পরিস্থিতিতে বিশেষ উপযোগী।

মূল্যায়ন: টমাস হবস বর্ণিত রাষ্ট্রতত্ত্ব পুরোপুরি ত্রুটিমুক্ত নয়। কাল্পনিক ও পরস্পরবিরোধী, গণতন্ত্রবিরোধী মতবাদ, দায়িত্ব-কর্তব্য উপেক্ষিত, বিপজ্জনক রাষ্ট্রচিন্তা ইত্যাদি নানান দিক থেকেই তাঁর তত্ত্বের সমালোচনা করা হয়ে থাকে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁর তত্ত্বের গুরুত্বকে অস্বীকার করা যায় না। এক্ষেত্রে তাঁর সবচেয়ে বড়ো অবদান হল তিনি অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে সর্বশক্তিমান রাষ্ট্র এবং জনগণের সম্মতির মধ্যে সামঞ্জস্যবিধান করতে সমর্থ হয়েছিলেন। স্যাবাইন (Sabine)-এর মতে, ইংরেজ ভাষাভাষী রাষ্ট্রতত্ত্বের লেখকদের মধ্যে হবস ছিলেন সর্বোচ্চ স্থানের অধিকারী।

৯। জন লকের রাষ্ট্রচিন্তার পরিচয় দাও

জন লকের রাষ্ট্রচিন্তা

টমাস হবসের অব্যবহিত পরেই ইংল্যান্ডের রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের প্রবক্তা জন লক এবং তাঁর গ্রন্থ Two Treatises of Government-এর অবদান অবিস্মরণীয়। *1 জন লকের রাষ্ট্রচিন্তার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলি হল-

(i) লক বর্ণিত প্রকৃতির রাজ্য এবং প্রাকৃতিক আইন: জন লক তাঁর রাষ্ট্রতত্ত্বে প্রাক্-রাষ্ট্রীয় জীবনে এক প্রকৃতির রাজ্য (State of Nature) -এর বর্ণনা করেছেন, যেখানে প্রাকৃতিক আইন (Natural Law) ও প্রাকৃতিক অধিকার (Natural Rights) প্রতিষ্ঠিত ছিল। এই সময় মানুষের জীবন ছিল সহজ ও স্বাভাবিক; সমাজ ছিল সাম্যবাদী। সর্বত্র বিরাজ করত শান্তি ও শৃঙ্খলা। স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ ছিল না, প্রাধান্য দেওয়া হত যুক্তি এবং বিচারকে। তবে কালের নিয়মে, প্রকৃতির রাজ্যে নানা সংকট উপস্থিত হয়। সম্পত্তির অধিকার ভোগ করাকে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে বৃদ্ধি পায় বৈষম্য। লকের মতে, মূলত ৩টি কারণে প্রকৃতির রাজ্যে অশান্তি বিরাজ করত, সেগুলি হল-

  • প্রাকৃতিক আইনের সীমাবদ্ধতা: এখানে কোনও লিখিত এবং সর্বজনগ্রাহ্য আইন ছিল না, যাকে ন্যায়-অন্যায়ের মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করা যায়।
  • স্বাভাবিক আইন বলবৎাযাগ্য নয়: তাছাড়া প্রচলিত স্বাভাবিক আইনকে বলবৎ করার কোনও ব্যবস্থা ছিল না। এমতাবস্থায় প্রকৃতির রাজ্যের সমস্ত সুযোগসুবিধা থাকা সত্ত্বেও জন লকের মতে, মানুষেরা স্বচ্ছন্দ ও নিরাপদ ছিল না।
  • নিরাপণ্ড বিচারব্যবস্থার অভাব: প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিরোধসমূহের মীমাংসা করার জন্য কোনও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা ছিল না।

এই সকল সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে মানুষ চুক্তির পথে পা বাড়ায় এবং গড়ে তোলে গণসমাজের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা।

(ii) চুক্তি মতবাদ: লকের মতে, প্রকৃতির রাজ্যের মানুষ রাজনৈতিক সমাজগঠনের জন্য দুটি পর্যায়ে চুক্তি করেছিল। সাধারণত এই দুটি চুক্তি হল-

  • সামাজিক চুক্তি: প্রকৃতির রাজ্যের মানুষের নিজেদের মধ্যে সংঘটিত এই চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র গড়ে ওঠে এবং
  • সরকারি চুক্তি: মানুষের সঙ্গে রাষ্ট্রশাসকের মধ্যে এই চুক্তি সম্পাদিত হয়।

লকের মতে, চুক্তির পর প্রকৃতির রাজ্যের মানুষ সার্বভৌম রাষ্ট্রশক্তির কাছে যেসকল অধিকারসমূহ সমর্পণ করেছিল, তা হল- আইন প্রণয়নের অধিকার, প্রণীত আইনের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের অধিকার এবং আইনভঙ্গকারীর অপরাধের বিচার করার অধিকার। তবে এমন কিছু অধিকারও ছিল, যা প্রকৃতির রাজ্যের মানুষ রাষ্ট্রশক্তির কাছে সমর্পণ করেনি, যেমন- ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির অধিকার।

(iii) জনগণ সার্বভৌম শক্তির আধার: রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা সম্পর্কে লক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেননি, তবে একেবারে যে নীরব ছিলেন তাও নয়। তিনি বলেছেন যে, রাষ্ট্র তার সার্বভৌম ক্ষমতার জোরে অবাধ ও যথেচ্ছ ক্ষমতার অধিকারী নয়। কারণ, সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস হল জনগণ। তারাই রাষ্ট্রের কাছে তাদের ক্ষমতা হস্তান্তরিত করেছিল।

(iv) সীমাবদ্ধ শাসনব্যবস্থা:

  • জনগণের সম্মতি: লকের মতে, রাষ্ট্রের শাসককে তৈরি করা হয়েছে মানুষের স্বাধীনতা, জীবন, সম্পত্তি রক্ষা তথা কল্যাণের জন্য। শাসক যদি অক্ষম, অযোগ্য ও জনকল্যাণে ব্যর্থ হন, তাহলে তাঁদের সরিয়ে দেওয়ার অধিকার জনগণের আছে।
  • আইনসভার ক্ষমতাচ্যুতি: লকের মতে, আইনসভাও চরম ক্ষমতার অধিকারী নয়। আইনসভা বা সরকার মানুষের আস্থা হারালে মানুষ আইনসভা বা সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার এবং নতুন চুক্তি সম্পাদন করার অধিকারী।
  • হস্তান্তরাযাগ্য নয়: লকের মতে, জনগণ হল আইন প্রণয়ন ক্ষমতার প্রকৃত অধিকারী। যেহেতু জনগণ স্বেচ্ছায় এই ক্ষমতা আইনপ্রণেতার হাতে দিয়েছে, তাই আইনপ্রণেতা এই ক্ষমতা অন্য কারও কাছে হস্তান্তর করতে পারেন না।

(v) সরকার এবং ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি: লকের মতে, রাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক বা অভিজাততান্ত্রিক সরকার যে ধরনেরই হোক না কেন, তাকে সবসময় রাষ্ট্রব্যবস্থার নির্দিষ্ট রীতিনীতি অনুযায়ী কাজ করতে হবে। তিনি সরকার কর্তৃক ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করার জন্য ক্ষমতার পৃথকীকরণের পরামর্শ দিয়েছেন।

  • আইন প্রণয়ন ও আইন কার্যকর করা: লক বলেছেন যে, আইন প্রণয়ন ও তা কার্যকর করা দুটি পৃথক কাজ। আইন প্রণয়নের ক্ষমতা ন্যস্ত থাকবে আইন বিভাগের হাতে এবং শাসন বিভাগীয় ক্ষমতা থাকবে শাসন বিভাগের হাতে।
  • ফেডারেটিভ ক্ষমতা: বহির্দেশীয় কার্যাবলি পরিচালনা করার জন্য লক ফেডারেটিভ ক্ষমতা (Federative Power)-র কথা বলেছেন। তবে এই ক্ষমতা প্রয়োগের বিষয়টি শাসকের বিচক্ষণতার উপর নির্ভরশীল। এই ক্ষেত্রে তিনি সম্মতি প্রদানকারী সমাজের কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন।

(vi) সম্পত্তির অধিকার: জন লকের রাষ্ট্রতত্ত্বে সম্পত্তির অধিকার তত্ত্বটি (Theory of Property) একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। লক বলেছেন, প্রকৃতির সম্পদ সকল মানুষই সমানভাবে ভোগ করার অধিকারী। আবার তিনি এও বলেছেন যে, মানুষ তার নিজ বুদ্ধির সঙ্গে কায়িক শ্রমকে মিশ্রিত করে যা অর্জন করে, সেটা তার ব্যক্তিগত সম্পত্তি। তবে লক মনে করেন যে, ব্যক্তির সেই পরিমাণ সম্পত্তির উপরেই অধিকার থাকবে, যে পরিমাণ সম্পত্তি নষ্ট না করে সে ব্যবহার করতে সক্ষম হবে। লক ব্যক্তিগত সম্পত্তির উপর সরকারি হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন।

(viii) বিরোধিতা ও বিপ্লব: জন লক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নাগরিকদের বিরোধিতা করার অধিকারকে স্বীকার করেছেন। লকের Two Treatises of Government গ্রন্থের Book-II-এর The Dissolution of Government শীর্ষক অধ্যায়ে সরকারের বিলুপ্তি প্রসঙ্গে জনগণের ভূমিকা উল্লিখিত হয়েছে। লক সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি বিপ্লব বা বিদ্রোহের কথা বলেননি। তাঁর মতে, শাসক বা সরকার যদি নাগরিকের অধিকার লঙ্ঘন করে; অবিচার, শোষণ বা নির্বাচনের প্রতীক হিসেবে কাজ করে, তখন তার বিরোধিতা করা নাগরিকদের সহজাত অধিকার।

মূল্যায়ন: রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা নানাভাবে লকের মতবাদের সমালোচনা করে থাকেন। যেমন- লকের তত্ত্বের বিষয়সমূহে মৌলিকত্বের অভাব, স্ববিরোধিতা দোষে দুষ্ট, পুঁজিবাদী সমাজের স্বার্থরক্ষা, এলিটিস্ট রাজনীতির সংকীর্ণতাকে প্রশ্রয়দান করা ইত্যাদি বিভিন্ন ত্রুটির কথা বলা হয়ে থাকে। তবে অধ্যাপক ম্যাক্সি (Maxey)-র মতে, রাষ্ট্রচিন্তার জগতে লকের বিশিষ্ট আসন অধিকার করার কারণ হল, পূর্বের বিক্ষিপ্ত ও অসংলগ্ন তত্ত্বগুলিকে তিনি একসূত্রে বাঁধতে সক্ষম হন। প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র, দায়িত্বশীল শাসনব্যবস্থা, আইনের শাসন, স্বাভাবিক অধিকারের তত্ত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও প্রতিফলিত হয়েছে লকের রাষ্ট্রচিন্তায়। সুতরাং, আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে জন লকের ভূমিকা যে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ, তা বলাইবাহুল্য।

১০। রোমান রাষ্ট্রচিন্তার বিভিন্ন দিকগুলি আলোচনা করো।

অথবা, রোমান রাষ্ট্রচিন্তার প্রকৃতি আলোচনা করো।

রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে প্রাচীন রোমের অবদান যে খুব চমকপ্রদ, একথা বলা যায় না। গ্রিক পণ্ডিত প্লেটো, অ্যারিস্টটল, সক্রেটিস প্রমুখ রাষ্ট্রপরিচালনার যে তাত্ত্বিক ধ্যানধারণা প্রচার করেছিলেন, রোমে তেমন কিছু ঘটেনি। বলা যেতে পারে, রোমান রাষ্ট্রচিন্তার মূলসূত্রগুলি গ্রিস থেকেই নেওয়া হয়েছে। তবে রোমান পণ্ডিত সিসেরো, সেনেকা এবং গ্রিস থেকে রোমে এসে রাষ্ট্রদর্শন চর্চাকারী পলিবিয়াস-এর লেখায় প্রাচীন রাষ্ট্রচিন্তার কিছু আভাস পাওয়া যায়।

প্রেক্ষাপট

রোমের ইতিহাস থেকেই এদেশের রাষ্ট্রচিন্তার মূলসূত্রটি অনুসন্ধান করা সম্ভব। প্রাচীন গ্রিসের মতো রোমান জনগণ একজাতি তত্ত্বের দাবি করতেন না। রোমে এটুস্ক্যান, গল, গ্রিক, স্যাবাইন ইত্যাদি নানা জাতির আগমন ও সহাবস্থান ঘটেছে। নানা জাতির সংমিশ্রণে সৃষ্টি হয়েছে রোমান জাতির। বলাবাহুল্য, এই বহুমুখী ভাষা, কৃষ্টি, ধর্মের সহাবস্থান ও সংমিশ্রণ রোমান রাষ্ট্রদর্শনের উপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল। এর পাশাপাশি ভৌগোলিক পরিবেশ, আর্থসামাজিক ব্যবস্থা, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ- এসবই রোমান রাষ্ট্রচিন্তা বিকাশের প্রেক্ষাপট গঠনে সাহায্য করেছিল।

রোমান রাষ্ট্রচিন্তার বিভিন্ন দিক/প্রকৃতি

(i) ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক: রোমান রাষ্ট্রচিন্তায় রাষ্ট্র ও ব্যক্তি- উভয়ের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব এবং মর্যাদা স্বীকৃতি পেয়েছে। রোমান রাষ্ট্রবিদদের মতে, রাষ্ট্র সমাজের এক স্বাভাবিক ও অপরিহার্য প্রতিষ্ঠান। ব্যক্তির অধিকারসমূহের সংরক্ষণই হল রাষ্ট্রের সর্বপ্রধান কাজ।

(ii) কর্মবাদে বিশ্বাস: রোমানদের রাষ্ট্রদর্শন মূলত কর্মের দর্শন। রোমান জনতা মূলত তত্ত্বকথার পরিবর্তে কর্মশক্তিতেই আস্থাশীল ছিলেন।

(iii) আইনের কর্তৃত্ব: রোমান রাষ্ট্রচিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল আইন সম্পর্কে ব্যাখ্যা প্রদান। স্টোয়িক দর্শন দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে রোমানরা আইনকে সুসংগঠিত রূপ দানে প্রয়াসী হন। অবশ্য এই আইনের উৎস ছিল বাস্তব প্রয়োজন। মূলত রাষ্ট্র ও সমাজের সংহতি এবং প্রগতির জন্য এই আইনের মান্যতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। রোমান আইনের প্রকৃতি ছিল দৃষ্টবাদ। দৃষ্টবাদী আইনের গুরুত্ব এখন সারা বিশ্বে স্বীকৃত। তাই রোমকে আধুনিক আইনব্যবস্থার সূতিকাগার বলা হয়।

(iv) বাস্তববাদিতা: রোমান রাষ্ট্রচিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল বাস্তববাদিতা। বাস্তবের কঠোর অভিজ্ঞতার প্রতিফলন দেখা যায় রোমান রাষ্ট্রচিন্তায়। রোমে প্রজাতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার সময় সামাজিক সংকট লক্ষ করা যায়। অভিজাত শ্রেণির (প্যাট্রিসিয়ান) সঙ্গে সাধারণ শ্রেণির (প্লেবিয়ান) মধ্যে বিরোধ সংকট সৃষ্টি করে। এই সংকট থেকে নিষ্পত্তির জন্য বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রয়োগ করা হয়। শাসনতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহের পুনর্বিন্যাস ও রাষ্ট্রীয় কার্যকলাপে উভয় শ্রেণির অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত করার মাধ্যমে সামাজিক সংহতি প্রতিষ্ঠিত হয়।

(v) চুক্তির ধারণা: রোমান রাষ্ট্রচিন্তায় চুক্তির মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা বলা হলেও রাষ্ট্র চুক্তির মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে সেকথা বলা হয়নি। রোমান রাষ্ট্রচিন্তায় সামাজিক চুক্তির ধারণাকে সমর্থন করা না হলেও সরকারি চুক্তির ধারণা এখানে গুরুত্ব পেয়েছে। রোমান চিন্তাবিদরা মনে করেন, শাসক ও শাসিতের সম্পর্ক চুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাঁদের মতে, জনসাধারণ চুক্তির দ্বারা সরকারি কর্তৃপক্ষের হাতে ক্ষমতা অর্পণ করে। তাই এইভাবে চুক্তি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত সরকারের বিরুদ্ধে জনসাধারণ বিদ্রোহ করতে পারে না, কারণ এর দ্বারা চুক্তি ভঙ্গ হয়।

(vi) মিশ্র শাসনব্যবস্থা: রোমান রাষ্ট্রচিন্তার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে সরকার ও সংবিধান সংক্রান্ত বিষয়েরও উল্লেখ করা যায়। মিশ্র শাসনব্যবস্থার ধারণাটি এক্ষেত্রে বলা প্রয়োজন। পলিবিয়াস মনে করেন যে, সরকারের স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজনীয় শাসন হল রাজতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র ও গণতন্ত্রের মধ্যে মিশ্রণ।

(vii) বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধের আদর্শ গঠন: বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধের আদর্শ গঠনও ছিল রোমান রাষ্ট্রচিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। রোমান চিন্তাবিদরা যে আইনতত্ত্ব উপস্থাপিত করেছিলেন তার মূল উৎস ছিল প্রকৃতির যুক্তিবাদিতা ও সাম্যের আদর্শ। স্টোয়িক দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হওয়ায় তাঁদের চিন্তাধারায় বিশ্বমানবতা ও বিশ্বজনীনতার আদর্শ পরিলক্ষিত হয় যা ছিল সত্যিই তাৎপর্যপূর্ণ।

১১। পলিবিয়াসের রাষ্ট্রচিন্তার সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।

উত্তর স্টোয়িক দর্শনকে পরিমার্জিত করে এবং রোমান রাষ্ট্রচিন্তাকে এক নতুন আঙ্গিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে যেসকল দার্শনিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন, পলিবিয়াস (Polybius) ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। যুগসন্ধিক্ষণের দার্শনিক হিসেবে গ্রিসের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভাঙন এবং রোমান সাম্রাজ্যের উত্থানের একজন প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন তিনি।

পলিবিয়াসের রাষ্ট্রচিন্তা

স্টোয়িক দর্শনের পথিকৃৎ পলিবিয়াস গ্রিসে তাঁর দর্শনচর্চা শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে গ্রিস রোমান সাম্রাজ্যভুক্ত হলে একজন যুদ্ধবন্দি হিসেবে তাঁকে রোমে নিয়ে আসা হয়। রোমে এসেই মূলত পলিবিয়াস রাষ্ট্রনীতি বিষয়ে তাঁর গবেষণা চালানোর সুযোগ পান।

(i) রাষ্ট্রচিন্তার স্বরূপ: পলিবিয়াস যখন হিস্ট্রি অফ রোম গ্রন্থ রচনা শুরু করেন তখন রোমান প্রজাতন্ত্রের স্বর্ণযুগ। তিনি এই গ্রন্থে রোমান সরকারের পক্ষে কীভাবে আইনকানুন এবং শাসনতন্ত্র প্রয়োগ করে একটি বৃহত্তর সাম্রাজ্য গড়ে তোলা সম্ভবপর হয়েছে, তারই বিস্তারিত ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন। রোম কীভাবে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্য হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে সমর্থ হয়েছে, এমনকি রোমান রাষ্ট্রশাসনের বিভিন্ন দিক এসকল বিষয় নিয়ে তিনি আলোচনা করেছেন। তাছাড়া রোমের উত্থান ও সাফল্যের ইতিহাস রচনার সঙ্গে সঙ্গে পলিবিয়াস রাষ্ট্রশাসন ও রাজনৈতিক পরিবর্তন সম্পর্কে কিছু তাত্ত্বিক আলোচনাও উপস্থাপন করেন।

(ii) স্বাভাবিক আবর্তন তত্ত্ব: পলিবিয়াস স্বাভাবিক আবর্তন তত্ত্ব (Natural Cycle) উপস্থাপিত করে সরকার বা শাসনব্যবস্থার বিভিন্ন ধরন এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রব্যবস্থার উৎপত্তি বর্ণনা করেন। এ ছাড়া অ্যারিস্টটলকে অনুসরণ করে তিনি বলেন যে, সরকার তিন ধরনের হতে পারে- রাজতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র ও গণতন্ত্র। প্রতিটি সরকারই ন্যায়নীতির রক্ষক কিংবা অত্যাচারী হতে পারে। এই কারণে সরকারের রূপের পরিবর্তন ঘটতে থাকে। পলিবিয়াস বলেন যে, প্রথম অবস্থায় রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার উদ্ভব ঘটে। কিন্তু অধিকাংশ রাজতন্ত্রই শেষপর্যন্ত স্বেচ্ছাচার ও নিপীড়নমূলক রাজনীতি গ্রহণ করে। এর প্রতিবাদে মানুষ সংগঠিত হয় এবং অভিজাততান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে স্বাগত জানায়। কিন্তু অভিজাতদের মধ্যে কেউ কেউ স্বার্থসিদ্ধির জন্য লোভ, ষড়যন্ত্র ও গোষ্ঠীবদ্ধতার শিকার হন। ফলে এই শাসনব্যবস্থাতেও ভাঙন দেখা দেয়। এসময় সাধারণ মানুষ অভিজাততন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগঠিত আন্দোলন গড়ে তুলতে বাধ্য হন। অবশেষে জনসাধারণের উদ্যোগে সূচনা ঘটে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার। অবশ্য পলিবিয়াস এরূপ আশঙ্কা করেন যে, গণতান্ত্রিক সরকারও যেমন বিপথগামী হতে পারে তেমনই সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা এবং উচ্ছৃঙ্খলতার প্রভাবে এই শাসন উচ্ছৃঙ্খল জনতার শাসনেও রূপান্তরিত হতে পারে।

(iii) মিশ্র শাসনতন্ত্রের ধারণা: রাষ্ট্রশাসন ব্যবস্থার এহেন পরিবর্তন রোধ করে স্থায়ী শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য পলিবিয়াস মিশ্র শাসনতন্ত্র (Mixed Rule)-এর প্রতিষ্ঠার পরামর্শ দেন। তাঁর মতে, রাজতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রদর্শনের সমন্বয়ে গঠিত একটি মিশ্র শাসনতন্ত্রই কার্যকরী হতে পারে। এই শাসনতন্ত্রকে রাষ্ট্রের পক্ষে স্থায়িত্ব, শক্তি ও শান্তির প্রতীকরূপে গণ্য করা সম্ভব। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, যে মিশ্র শাসনব্যবস্থা তথা সরকারের ধারণা তিনি উপস্থাপিত করেছেন সেখানে রাজা থাকবেন শাসনক্ষমতার শীর্ষে, জ্ঞানীগুণী অভিজাতরা হবেন রাজার উপদেষ্টা ও আইনসভা জনগণ দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত হবে। নগররাষ্ট্র স্পার্টায় লাইকারগাস (Lycurgus) স্পার্টানদের মধ্যে নিয়মশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে আংশিকভাবে এই প্রকার সমন্বয় সাধনে সক্ষম হয়েছিলেন। প্রসঙ্গত পলিবিয়াস রোমান প্রজাতান্ত্রিক যুগের শাসনব্যবস্থার দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন। তিনি দেখান যে, প্রজাতন্ত্রের যুগে কনসাল ছিলেন রাজার মতোই ক্ষমতাশালী। কিন্তু তাঁর স্বেচ্ছাচারী হওয়ার সুযোগ ছিল না। সিনেট-এর সদস্যরা ছিলেন ধনী, প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ- তাঁরা ছিলেন অভিজাততন্ত্রের প্রতীক। অন্যদিকে জনগণের সভা (কমিসিয়া সেঞ্চুরিয়াটা) ছিল গণতন্ত্রের প্রতিভূ। বাস্তবিক ক্ষেত্রে বলা যায় যে কনসাল, সিনেট এবং জনগণের মধ্যে একরকম নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্যের নীতি (The principle of Checks and Balances) প্রচলিত ছিল। বলাবাহুল্য এই ত্রয়ীর শাসনকালে রোম গৌরবের শীর্ষে আরোহণ করতে পেরেছিল।

(iv) যুক্তিবাদিতা: বস্তুতপক্ষে যুক্তিবাদিতা ছিল পলিবিয়াসের কল্পিত সরকারের অপর বৈশিষ্ট্য। তাঁর মতানুযায়ী, সমকালীন রোমে শ্রেণি নিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। যুক্তির দ্বারা প্রধানত রাষ্ট্র ও সরকারের কাঠামো পরিচালিত হত। তিনি আরও বলেন যে, সরকারি ভারসাম্য নীতির প্রধান লক্ষ্যই হবে সমভাবে সাধারণ মানুষের স্বার্থের সুরক্ষা করা।

মূল্যায়ন

পলিবিয়াসের রাষ্ট্রচিন্তাও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। সমালোচকদের মতে, বিভিন্ন পরস্পরবিরোধী আদর্শের একত্রে সংমিশ্রণ করার ক্ষেত্রে তার প্রয়াস বাস্তবসম্মত নয়। তাছাড়া পলিবিয়াসের বিশ্বজনীন আইনের ধারণাও বাস্তবের সঙ্গে খুব একটা সংগতিপূর্ণ নয় বলে অনেকে মনে করেন। এসব সত্ত্বেও বলা যায় পলিবিয়াসের রাষ্ট্রদর্শনে নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য (Check and Balance)-এর তত্ত্ব উপস্থাপিত হয়েছে। তিনি মনে করেন যে, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি বা গোষ্ঠী স্বার্থকেন্দ্রিক ঘাতপ্রতিঘাতের (Interaction) মধ্য দিয়ে একটি ভারসাম্য বিশিষ্ট শাসনধারা অনুসরণ করতে পারবে। স্যাবাইন-এর মতে, পলিবিয়াসের মিশ্র শাসনতন্ত্রের ধারণা পরবর্তীকালে ফরাসি দার্শনিক মন্তেস্কু এবং মার্কিন সংবিধান রচয়িতাদের প্রভাবিত করেছিল। গেটেল বলেছেন যে, পলিবিয়াসের এই নিরপেক্ষ ও মোহমুক্ত দৃষ্টিভঙ্গির আদর্শ ম্যাকিয়াভেলির রাষ্ট্রচিন্তায় প্রতিফলিত হয়েছে। আবার ডানিং মনে করেন যে, পলিবিয়াসের রাষ্ট্রদর্শন আধুনিক যুগের উদারতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে অনুপ্রাণিত করতে সক্ষম।

১৩। সংক্ষেপে লেখো- নতুন রাজতন্ত্র ও টমাস ক্রমওয়েলের অবদান।

পঞ্চদশ থেকে সপ্তদশ শতকের মধ্যে পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এক নতুন ধরনের সর্বশক্তিমান রাষ্ট্রের উদ্ভব প্রক্রিয়া দেখা দিয়েছিল। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, স্পেন প্রভৃতি দেশে প্রথম আধুনিক জাতিরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে রাজতন্ত্র বিকাশলাভ করে, যা নব্য রাজতন্ত্র নামে পরিচিত। ইংল্যান্ডের ক্ষেত্রে সপ্তম হেনরির (Henry VII) রাজত্বকাল এক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করে। তাঁর উত্তরসূরি অষ্টম হেনরির (Henry VIII) আমলে এই রাজতন্ত্র পরিপূর্ণতা লাভ করে এবং এক্ষেত্রে তাঁর প্রধান পরামর্শদাতা ও প্রধানমন্ত্রী টমাস ক্রমওয়েল-এর অবদান ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বস্তুতপক্ষে, ক্রমওয়েলের উদ্যোগেই ইংল্যান্ডের রাজতন্ত্র সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

নতুন রাজতন্ত্র বা নব্য রাজতন্ত্র

সপ্তম হেনরির হাত ধরেই ইংল্যান্ডে মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগের সূচনা ঘটে। তাঁর শাসনকালে। ইংল্যান্ডে আইন, শাসন, বিচার, ধর্ম, পার্লামেন্ট এমনকি পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ে নতুন নতুন দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। তিনি সংসদকে (পার্লামেন্ট) নিজের কর্তৃত্বাধীনে এনে, আর্থিক উন্নতিসাধনের মাধ্যমে অভিজাত শ্রেণির উপর নির্ভরশীলতাকে হ্রাস করে রাজতন্ত্রকে যেভাবে নবরূপ দান করেছিলেন- তা ইতিহাসে নতুন রাজতন্ত্র নামে পরিচিতি লাভ করে। ঐতিহাসিক জন রিচার্ড গ্রিন (John Richard Green) সর্বপ্রথম তাঁর গ্রন্থে টিউডর রাজতন্ত্রকে নব্য রাজতন্ত্র (New Monarchy) আখ্যা দেন।

সপ্তম হেনরি প্রবর্তিত এই নব্য রাজতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলি হল-

(i) রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা

ইংল্যান্ডের সিংহাসনের অধিকারকে কেন্দ্র করে ইয়র্ক হাউস (House of York) ও ল্যাঙ্কাস্টার হাউসের (House of Lancaster) মধ্যে দীর্ঘ ৩০ বছরব্যাপী গোলাপের যুদ্ধ (War of the Roses, ১৪৫৫-১৪৮৫/১৪৮৭ খ্রিস্টাব্দ) সংঘটিত হয়। এর মধ্যে ১৪৮৫ খ্রিস্টাব্দে বসওয়ার্থের যুদ্ধে (Battle of Bosworth) ল্যাঙ্কাস্টার বংশীয় রিচমন্ডের আর্ল হেনরি (Henry Tudor, Earl of Richmond) পরাস্ত করেন ইয়র্ক বংশীয় তৃতীয় রিচার্ড (Richard III)-কে। এরপর আর্ল হেনরি সপ্তম হেনরি উপাধি গ্রহণ করে ইংল্যান্ডে টিউডর (Tudor) রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন, যার প্রধান লক্ষ্য ছিল রাজার ক্ষমতা দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা। এসময় সপ্তম হেনরি ইয়র্কশায়ার গোষ্ঠীভুক্ত চতুর্থ এডওয়ার্ডের (Edward IV) কন্যা এলিজাবেথ (Elizabeth of York)-কে বিবাহ করলে, দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ইয়র্ক হাউস ও ল্যাঙ্কাস্টার হাউস ঐক্যবদ্ধ হয়। এতে যে রাজনৈতিক ঐক্যের সূচনা হয়, তা ইংল্যান্ডের আয়তন, শক্তি ও মর্যাদা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

(ii) পার্লামেন্টের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা

পার্লামেন্টের সঙ্গে সপ্তম হেনরির সম্পর্ক ও নীতি ছিল বেশ চমকপ্রদ ও বৈপ্লবিক। Livery ও Maintenance আইন দ্বারা সপ্তম হেনরি সামন্তপ্রভুদের ক্ষমতা খর্ব করে রাজার ক্ষমতা সুসংহত করতে উদ্যত হন। বলা যায় যে, স্বল্প সময়ের জন্য এবং সংখ্যায় কম পার্লামেন্ট ডাকলেও তার মধ্যেই পার্লামেন্টের মাধ্যমে তিনি যত সংখ্যক আইন প্রণয়ন করেছিলেন তা 1 আগে কখনও হয়নি। ফলে পার্লামেন্টের গুরুত্ব এসময় যথেষ্ট বৃদ্ধি পায়।

(iii) সামন্তদের দমন

রাজত্বের শুরু থেকেই সপ্তম হেনরি সামন্তপ্রভুদের ক্ষমতা সংকুচিত করতে উদ্যত হয়েছিলেন। তাঁর শাসনকালে স্পেন, ফ্রান্স ও স্কটল্যান্ডের রাজপরিবারগুলির সঙ্গে ইংল্যান্ডের বৈবাহিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ফলস্বরূপ সামন্তপ্রভুদের ক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে এবং টিউডর রাজবংশের মর্যাদা ও গৌরব বৃদ্ধি পায়।

(iv) মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব

টিউডর আমলে ইংল্যান্ডে মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি রাজতন্ত্রের সমর্থকে পরিণত হয়।

(v) সুষ্ঠু বিচারব্যবস্থা প্রণয়ন

সপ্তম হেনরি ইংল্যান্ডে সামন্ত শ্রেণির প্রভাবমুক্ত এক সুষ্ঠু বিচারব্যবস্থা প্রণয়নে সচেষ্ট হন। এই সময় ইংল্যান্ডে বিভিন্ন ধরনের আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়। এইভাবে সপ্তম হেনরি বিচারব্যবস্থার সংস্কারের মাধ্যমে বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন।*

টমাস ক্রমওয়েলের অবদান

ইংল্যান্ডের সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম রূপকার টমাস ক্রমওয়েল (Thomas Cromwell) ছিলেন রাজা অষ্টম হেনরির প্রধান পরামর্শদাতা ও সচিব। ১৫২০ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইংল্যান্ডরাজ অষ্টম হেনরির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কার্ডিনাল উলসির (Cardinal Thomas Wolsey) সেক্রেটারি হিসেবে নিযুক্ত হন এবং এসময় থেকেই ইংল্যান্ডের রাজনীতির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগসূত্র স্থাপিত হয়। এই সময় অষ্টম হেনরির বিবাহবিচ্ছেদ সংক্রান্ত সমস্যার নিষ্পত্তিতে ব্যর্থ উলসিকে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে পদচ্যুত করা হয় এবং তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন টমাস ক্রমওয়েল। পরবর্তীকালে ক্রমওয়েল রাজা অষ্টম হেনরির ভাইকার জেনারেল ও চ্যান্সেলার পদেও নিযুক্ত হন। নব্য রাজতন্ত্রের টমাস ক্রমওয়েল আদর্শকে সুদৃঢ় ভিত্তি প্রদান করতে ক্রমওয়েল যেসকল পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তা হল-

(i) চার্চে রাজার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা

ইংল্যান্ডের শাসক অষ্টম হেনরি এবং রানি ক্যাথরিন (Catherine of Aragon)-এর বিবাহবিচ্ছেদকে কেন্দ্র করে পোপের সঙ্গে রাজার বিরোধ দেখা দেয়। পোপ নানাভাবে অষ্টম হেনরির বিবাহবিচ্ছেদে অনুমতি দানের বিষয়ে বিলম্ব করতে থাকেন। এমতাবস্থায়, ক্রমওয়েল অষ্টম হেনরিকে পরামর্শ দেন যে এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে, রাজার উচিত নিজেকে ইংল্যান্ডের চার্চের সর্বময় কর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। ক্রমওয়েলের উদ্যোগে ১৫৩১ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ ধর্মযাজকগণ Christ Doth-এর অনুমোদনক্রমে রাজা অষ্টম হেনরিকে ইংল্যান্ডের চার্চের সমস্ত ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে ঘোষণা করেন। এই ঘোষণার ভিত্তিতে রাজার কর্তৃত্বকে বৈধতা প্রদানের উদ্দেশ্যে, ক্রমওয়েলের উদ্যোগে নানা আইন পাস হলে চার্চগুলিতে পোপের পরিবর্তে রাজার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

(ii) ধর্মসংস্কার

জাতীয় রাষ্ট্র গড়ে তুলতে ও রাজার ক্ষমতাকে প্রাধান্য দিতে হলে, তৎকালীন রাষ্ট্রব্যবস্থায় পোপতন্ত্র, যাজক কিংবা মঠতন্ত্রের ক্ষমতা খর্ব করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন ক্রমওয়েল। তাঁর উদ্যোগে ইংল্যান্ড থেকে রোমান চার্চকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য পার্লামেন্টকে ব্যবহার করা হয়েছিল। রাজার প্রতি অনুগত এই পার্লামেন্টই ইতিহাসে পরিচিত রিফরমেশন পার্লামেন্ট (English Reformation Parliament, ১৫২৯-১৫৩৬ খ্রিস্টাব্দ) নামে। এই পার্লামেন্টে রাজা অষ্টম হেনরির পক্ষে বিভিন্ন আইন পাস করা হয়, যেমন- প্রোবেট অ্যান্ড মরচুয়ারি অ্যাক্ট, অ্যাক্ট অফ প্লুরালিটিজ, রেসট্রেন্ট অফ অ্যাপিলস ইত্যাদি। বস্তুতপক্ষে, রিফরমেশন পার্লামেন্ট প্রণীত এই সকল আইন দ্বারাই ইংল্যান্ডে ধর্মসংস্কার সম্পূর্ণ করা হয়।

(iii) জাতীয় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠায় অ্যাক্ট অফ সুপ্রিমেসি

নব্য রাজতন্ত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য জাতীয় সার্বভৌমত্বের নীতি রূপায়ণে টমাস ক্রমওয়েল বদ্ধপরিকর ছিলেন। এক্ষেত্রে ১৫৩৪ খ্রিস্টাব্দে প্রণীত অ্যাক্ট অফ সুপ্রিমেসি (Act of Supremacy) আইনটি ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এই আইন অনুসারে ইংল্যান্ডের রাজাকে চার্চের প্রধান কর্তৃত্বরূপে আইনগত স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। এভাবেই চার্চ ও রাষ্ট্র উভয়ের উপরেই রাজার কর্তৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।

(iv) মঠের প্রাধান্য খর্ব

ইংল্যান্ডে চার্চের মতো মঠগুলিরও দৌরাত্ম্য কম ছিল না। অনেকক্ষেত্রে তারা রাজার শাসন অগ্রাহ্য করত, যা একটি জাতীয় রাষ্ট্রের পক্ষে ছিল ক্ষতিকারক। এই চরম সত্য উপলব্ধি করে টমাস ক্রমওয়েল মঠগুলি ধ্বংসসাধনে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেন। ক্রমওয়েল মঠগুলির ধ্বংসসাধনের উদ্দেশ্যে দুটি আইন পাস করেন যথা- প্রথম উচ্ছেদ আইন (১৫৩৬ খ্রিস্টাব্দ) ও দ্বিতীয় উচ্ছেদ আইন (১৫৩৯ খ্রিস্টাব্দ)। এই ঘটনার দরুন মঠগুলি রাজার নিয়ন্ত্রণে আসে ও ইংল্যান্ডে রাজার ক্ষমতা, মর্যাদা ও আর্থিক প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পায়।

(v) প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তন

ক্রমওয়েল প্রশাসনের মধ্যযুগীয় কাঠামোর অবসান ঘটিয়ে জাতীয় আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর প্রবর্তন করেন। এই ব্যবস্থায় রাজা দুর্বল হলেও রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হয় না কারণ এই শাসনকাঠামোর শীর্ষে থাকেন মন্ত্রীসভা। এ ছাড়া ১৯ জন সদস্যকে নিয়ে ক্রমওয়েল প্রিভি কাউন্সিল (Privy Council) গঠন করেন এবং নিজে প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি পদে আসীন হন।

(vi) অর্থবিভাগের সংস্কার

আর্থিক প্রশাসনিক বিভাগ প্রবর্তন করে ক্রমওয়েল আয় বৃদ্ধি করেন। আর্থিক বিষয় দেখাশোনার জন্য তিনি ছ’টি পৃথক বিভাগ প্রবর্তন করেন। এইভাবে মধ্যযুগীয় ব্যবস্থা থেকে নতুন রাষ্ট্রকাঠামো প্রবর্তন করে ইংল্যান্ডে নব্য রাজতন্ত্রের সত্তাকে টমাস ক্রমওয়েল জাগরিত করেন।

পরিশেষে বলা যায় যে, আধুনিক ইংল্যান্ডের শাসনকাঠামোর বিকাশে টমাস ক্রমওয়েল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাঁর গৃহীত পদক্ষেপগুলির দরুনই ইংল্যান্ডে নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

১৪। ধর্মীয় ক্ষেত্রে এবং পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে টমাস ক্রমওয়েলের কার্যকলাপের মূল্যায়ন করো।

অথবা, টমাস ক্রমওয়েলের কার্যাবলির মূল্যায়ন করো।

ধর্মীয় ক্ষেত্রে টমাস ক্রমওয়েলের কার্যকলাপ

ইংল্যান্ডরাজ অষ্টম হেনরির প্রধান সচিব টমাস ক্রমওয়েল ধর্মীয় ক্ষেত্রে যে পদক্ষেপগুলি গ্রহণ করেন তা হল নিম্নরূপ-

(i) চার্চে পোপের পরিবর্তে রাজার ক্ষমতাবৃদ্ধি

ইংল্যান্ডের শাসক অষ্টম হেনরির, ক্যাথরিনের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ ও অ্যান বোলিনকে বিবাহের বিষয়ে পোপের সঙ্গে মতপার্থক্য দেখা দেয়। টমাস ক্রমওয়েল এই সমস্যার সমাধানের জন্য, রাজাকে চার্চের সকল ক্ষমতার অধিকারী করে তোলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তাই তিনি চার্চে রাজার প্রাধান্যকেই গুরুত্ব দেন। টমাস ক্রমওয়েলের সক্রিয়তায় ১৫৩১ খ্রিস্টাব্দে চার্চে পোপের পরিবর্তে রাজাকেই (অষ্টম হেনরি) চার্চের প্রধান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এইভাবে চার্চগুলিতে রাজার ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়।

(ii) ধর্মসংস্কার আন্দোলনকে সমর্থন দান

ক্রমওয়েল ইংল্যান্ডের ধর্মসংস্কার আন্দোলনকে সফল করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং রাজা অষ্টম হেনরির পূর্বতন মন্ত্রী ও পরামর্শদাতা কার্ডিনাল উলসির বিরোধিতায় সচেষ্ট হন।

(iii) রিফরমেশন পার্লামেন্ট

ইংল্যান্ডে স্বাধীন চার্চ প্রতিষ্ঠা এবং রাজার ক্ষমতাবৃদ্ধিতে ক্রমওয়েল রিফরমেশন পার্লামেন্টের সাহায্যে বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করেন। আইনগুলির মূল উদ্দেশ্যই ছিল ধর্মসংস্কার। যেমন প্রোবেট অ্যান্ড মরচুয়ারি অ্যাক্টে ধর্মীয় আদালতে উইলের প্রতিলিপি সংক্রান্ত অধিকারকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। অ্যাক্ট অফ অ্যানেটসের মাধ্যমে পোপেদের প্রাপ্ত কর থেকে বঞ্চিত করা হয়। পোপের কাছে কেউ যাতে ধর্মীয় কোনও বিষয় অভিযোগ জানাতে না পারে তার জন্য অ্যাক্ট ইন রেসট্রেন্ট অফ অ্যাপিলস নামক আইন প্রণয়ন করা হয়। এ ছাড়াও অ্যাক্ট অফ প্লুরালিটিজ দ্বারা যাজকদের নানান সুযোগসুবিধার উপর বিধিনিষেধ এবং প্রেমুনিয়ার আইনে আইন ভঙ্গকারী যাজকদের ১ লক্ষ পাউন্ড জরিমানা ধার্য করা হয়।

(iv) অ্যাক্ট অফ সুপ্রিমেসি পাস

চার্চ ও পোপতন্ত্রের প্রাধান্য হ্রাস করার জন্য টমাস ক্রমওয়েল যে আইনগুলি পাস করেছিলেন, তার মধ্যে অন্যতম ছিল অ্যাক্ট অফ সুপ্রিমেসি (১৫৩৪ খ্রিস্টাব্দ)। এই আইন দ্বারা ইংল্যান্ডের চার্চের উপর রাজার সার্বভৌমত্বকে আইনগত স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। এ ছাড়া এতদিন পর্যন্ত ইংল্যান্ডের চার্চের উপর পোপের যে একাধিপত্য ছিল, তা অ্যাক্ট অফ সুপ্রিমেসির মাধ্যমে লুপ্ত করা হয়। ফলে চার্চ ও রাষ্ট্র উভয়ের উপর রাজার কর্তৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।

(v) মঠগুলির উচ্ছেদসাধন

ইংল্যান্ডে রাজার কর্তৃত্বকে সর্বক্ষেত্রে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠায় টমাস ক্রমওয়েল যে নানাবিধ উদ্যোগ নেন, তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল মঠব্যবস্থার উচ্ছেদসাধন। ইংল্যান্ডের মঠগুলি ছিল প্রভৃত পরিমাণ ধনসম্পত্তির অধিকারী এবং মঠের জীবনও ছিল কলুষতাপূর্ণ। রাজার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য ক্রমওয়েল ইংল্যান্ডের ছোটো ছোটো মঠগুলি বাজেয়াপ্ত করার উদ্যোগ নেন এবং মঠের সম্পত্তির বাজেয়াপ্তকরণ দ্বারা তিনি রাজকোশাগারের আয় বৃদ্ধি করেন। এক্ষেত্রে টমাস ক্রমওয়েল দুটি আইন পাস করেছিলেন, যথা-

  • প্রথম উচ্ছেদ আইন (Suppression of Religious Houses Act, ১৫৩৬ খ্রি.): এর দ্বারা ২০০ পাউন্ড-এর কম বাৎসরিক আয়সম্পন্ন মঠগুলিকে তিনি দুর্নীতির অভিযোগে ভেঙে দেন। ক্ষুদ্র মঠগুলির উচ্ছেদসাধনের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াস্বরূপ লিঙ্কনশায়ার, ইয়র্কশায়ার এবং ধীরে ধীরে সমগ্র উত্তর ইংল্যান্ডে এক বিদ্রোহের (পিলগ্রিমেজ অফ গ্রেস) সূচনা হয়। কিন্তু টমাস ক্রমওয়েল কঠোরভাবে এই বিদ্রোহ দমন করে যাজকদের রাজার প্রতি আনুগত্যের শপথগ্রহণে বাধ্য করেন।
  • দ্বিতীয় উচ্ছেদ আইন (Suppression of Religious Houses Act, ১৫৩৯ খ্রি.): এর দ্বারা ইংল্যান্ডের অবশিষ্ট বৃহৎ মঠগুলির উচ্ছেদসাধন করে সমস্ত সম্পত্তি রাজার অধিকারে আনা হয়। এইভাবে তিনি ইংল্যান্ডের চার্চতন্ত্রের প্রাধান্যরোধে সচেষ্ট হয়েছিলেন।
(vi) বাইবেল-এর অনুবাদ

টমাস ক্রমওয়েল মাইলস কভারডেলকে (Myles Coverdale) ইংরেজি ভাষায় বাইবেল অনুবাদে প্রেরণা দেন। মূলত ক্রমওয়েলের উদ্যোগেই ইংল্যান্ডের ছাপাখানায় পবিত্র বাইবেল-এর ইংরেজি অনুবাদ মুদ্রিত হয়। তাঁর উৎসাহে কভারডেল ১৫৩৯ খ্রিস্টাব্দে গ্রেট বাইবেল প্রকাশ করেন, যা ইংল্যান্ডের জনগণের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে টমাস ক্রমওয়েলের কার্যকলাপ

টমাস ক্রমওয়েল ইংল্যান্ডের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন।

(i) পোপ তথা ইটালির সঙ্গে সম্পর্ক

ইংল্যান্ডরাজ অষ্টম হেনরির বিবাহবিচ্ছেদ ও পুনর্বিবাহকে কেন্দ্র করে পোপের সঙ্গে ইংল্যান্ডের দ্বন্দ্ব চরম পর্যায়ে পৌঁছোয়। এই পরিস্থিতিতে টমাস ক্রমওয়েল রিফরমেশন পার্লামেন্টের আইনবলে ইংল্যান্ডের চার্চকে পোপের প্রভাবমুক্ত করে অষ্টম হেনরির অধীনস্থ করেন। ক্যান্টারবেরির আর্চবিশপকে যাজক পদে নিযুক্ত করা হয় এবং রোমের পোপকে বার্ষিক ধর্মীয় করপ্রদান বন্ধ করা হয়। এভাবে সুকৌশলে টমাস ক্রমওয়েল ইটালির সঙ্গে ইংল্যান্ডের সম্পর্ক ছিন্ন করেন।

(ii) ফ্রান্সের সঙ্গে সম্পর্ক

ক্যাথরিনের সঙ্গে অষ্টম হেনরির বিবাহবিচ্ছেদের পর স্পেনরাজ পঞ্চম চার্লস ইংল্যান্ডের শত্রুতে পরিণত হন। এই পরিস্থিতিতে টমাস ক্রমওয়েল স্পেনরাজের প্রতিদ্বন্দ্বী ফরাসিরাজের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করেন। টমাস ক্রমওয়েল ফ্রান্সের সঙ্গে বৈদেশিক সুসম্পর্ক বজায় রাখতে বিশেষভাবে সচেষ্ট হন।

(iii) জার্মানির সঙ্গে সম্পর্ক

টমাস ক্রমওয়েল ইংল্যান্ডের নিরাপত্তার জন্য জার্মানির রাজন্যবর্গের সমর্থনলাভের চেষ্টা করেন। ফলে সাময়িকভাবে হলেও ইংল্যান্ডের সঙ্গে জার্মানির রাজন্যবর্গের মিত্রতার সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

মূল্যায়ন

টমাস ক্রমওয়েল ধর্মীয় ও পররাষ্ট্রনীতি-উভয়ক্ষেত্রেই যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন তা ইংল্যান্ডের সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে গভীর পরিবর্তনের সূচনা করেছিল। ধর্মীয় ক্ষেত্রে মঠগুলির ধ্বংসসাধনের ফলে ইংল্যান্ডে পোপতন্ত্রের ক্ষমতা যেমন বিনষ্ট হয়, তেমনই মঠের বিশাল সম্পদকে রাষ্ট্রের আর্থিক উন্নয়নের কাজে লাগানো হয়। অন্যদিকে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বলা যায় যে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে ইংল্যান্ডের সুসম্পর্ক বজায় রাখার লক্ষ্যে ক্রমওয়েলের বৈদেশিক নীতি পরিচালিত হয়েছিল। পার্লামেন্টের আইনের সাহায্যে যে নীতি ও ব্যবস্থা রূপায়ণের জন্য ক্রমওয়েল সচেষ্ট হয়েছিলেন, সেখানে কেউ রাষ্ট্রের বিরোধিতা করতে পারেনি। তাঁর নীতি খুব স্বল্পসংখ্যক মানুষকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। সামগ্রিকভাবে টমাস ক্রমওয়েলের ধর্মীয় ও পররাষ্ট্রনীতির সাহায্যে ইংল্যান্ডে বিপ্লব সাধিত হয়। তাই বলা যায়, সমকাল ও পরবর্তীকালের ইংল্যান্ডের জাতীয় জীবনে টমাস ক্রমওয়েলের অবদান ছিল অনস্বীকার্য।

আরও পড়ুন – রাষ্ট্রের প্রকৃতি প্রশ্ন উত্তর

Leave a Comment